অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নে সরকারের পরিকল্পনা, বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নে সরকারের পরিকল্পনা, বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ

সরকার দেশের অর্থনীতিতে অলিগার্কদের আধিপত্য ভেঙে সাধারণ মানুষের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন’ ধারণা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো বৈষম্য কমানো, সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বাড়ানো এবং কৃষক ও নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। এ লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি ও কৃষি কার্ড’ ও ‘একটি গ্রাম একটি পণ্য’ কর্মসূচি চালু করার পাশাপাশি কর্মসংস্থানভিত্তিক শিল্পায়নে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো অন্যতম লক্ষ্য।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য

রোববার এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করার কথা বলেন। তিনি বলেন, দেশের মূলধারার অর্থনীতির বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে সরকার ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’ ধারণার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সমাজের যেসব মানুষ এখনো আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন, তাদের মূলধারায় যুক্ত করাই সরকারের লক্ষ্য। নাগরিক হিসাবে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ সবার অধিকার, তাই শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারেও এই ইস্যুকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতামত

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা সরকারের এসব কর্মসূচিকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তারা বলছেন, লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারকে আরও সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে অর্থনীতিসহ দেশের বিভিন্ন সেক্টরকে জিম্মি করে রাখা শক্তিধর অলিগার্কদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তাদের কোনো ছাড় না দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে, যত বড় শক্তিধর হোক না কেন, অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, সরকারের পরিকল্পনা ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নে সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারি ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে, যেমন মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমানো। বিনিয়োগের জন্য বাস্তবসম্মত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, কারণ বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে না। তিনি পরামর্শ দেন, সরকারের সম্পদ শেয়ারবাজারে আনতে হবে, যেমন বিভিন্ন সরকারি কোম্পানি ও বহুজাতিক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার তালিকাভুক্ত করতে হবে।

বিজিএমইএ সাবেক সভাপতির বক্তব্য

তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন একটি ভালো উদ্যোগ। তবে এজন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঠিক করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে হবে।

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের অর্থনৈতিক খাতের প্রথম এজেন্ডা হলো অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন। ইশতেহারে বলা হয়েছে, অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক এবং সবার জন্য উন্মুক্ত। অলিগার্ক কাঠামো ভেঙে এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের প্রকৃত অংশীদারত্ব থাকবে। ন্যায্য মূল্যবণ্টন, অর্থায়ন ও বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে করা হবে বিনিয়োগনির্ভর।

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৪৬০ বিলিয়ন ডলার। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতির আকার ট্রিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, অর্থাৎ আগামী ৮ বছরে অর্থনীতির আকার দ্বিগুণের বেশি বাড়াতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতামত

তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারকে এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বাস্তবভিত্তিক অনেক কাজ করতে হবে। অলিগার্কদের বিরুদ্ধে আইনানুগ শক্ত ব্যবস্থা নেওয়াটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী এই কঠিন কাজটা করে জনগণকে দেখাতে হবে। সেটি যতক্ষণ করতে না পারছে, ততক্ষণ সাধারণ মানুষ সরকারকে বাকি কাজের জন্য বিশ্বাস করতে চাইবে না।

তারা আরও বলেন, সরকারের মেয়াদ তিন মাস পার হতে চলেছে, কিন্তু সমাজের চিহ্নিত অনেক অলিগার্কের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। উপরন্তু কিছু কিছু পদক্ষেপ অলিগার্কদের পুনর্বাসনের পক্ষে চলে গেছে। ফলে সরকারকে এসব বিষয়ে আরও সতর্ক হতে হবে। তা না হলে ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা কাগুজে প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হবে।

বাংলাদেশ এমপ্লায়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি

বাংলাদেশ এমপ্লায়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, সরকারের এই উদ্যোগ অত্যন্ত ইতিবাচক এবং সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতি সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। অলিগার্করা জিম্মি করে রেখেছে। কিন্তু গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত হলে আমাদের আর সিন্ডিকেটের কবলে পড়তে হবে না।’ উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো শুধু বড় কয়েকজন ব্যবসায়ীকে ঋণপত্র খোলার সুযোগ দেয়, ফলে ছোট ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে পড়েন। চিনি আমদানিকারক এখন মাত্র ৪ জন, ডাল, গম এবং অন্যান্য নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মাত্র কয়েকজন ব্যক্তি ১৮ কোটি মানুষের খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করবে, এটা হতে পারে না।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ নিচ্ছে ১৪ শতাংশ, যা যৌক্তিক নয়। কারণ প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ১৪ শতাংশ মুনাফা করতে পারে না। সত্যিকার অর্থে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন নিশ্চিত করতে পারলে সবার জন্য কল্যাণকর হবে, তবে এটি বাস্তবায়ন কঠিন চ্যালেঞ্জের কাজ।

সংশ্লিষ্টদের মতামত

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অর্থনীতিতে বৈষম্য ও কেন্দ্রীয়করণের অভিযোগ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাংকিং খাত, বড় অবকাঠামো প্রকল্প, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এবং শিল্প খাতে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য চলছে। ফলে বিএনপির এই প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও বাস্তবায়নের জন্য গভীর কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

তাদের মতে, ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি’ বলতে শুধু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানো বোঝায় না, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও বাজারে সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও এর অংশ। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ, নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্টআপ সহায়তা এবং কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়নের মতো সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নিতে হবে।