হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে আবারও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে চোরাকারবারি মাফিয়া চক্র। অতি সম্প্রতি বিমানবন্দর থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার স্বর্ণ জব্দ, জাল ভিসায় একযোগে ৭৬ জনকে মালয়েশিয়ায় পাচারের চেষ্টা এবং কার্গো ভিলেজ থেকে ৪ হাজার কেজি মালামাল বিনা শুল্কে বের করে নেওয়ার মতো একের পর এক চাঞ্চল্যকর অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। বিমানবন্দর কেন্দ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো নজরদারি বাড়ালেও চোরাকারবারিরা নিরাপত্তার ফাঁকফোকর গলিয়ে তাদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা চালাচ্ছে, যা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
৪ দিনে ১০০ কোটির স্বর্ণ জব্দ, বিমানের অভ্যন্তরেই ‘ভেতরের লোক’
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২ জুলাই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের কার্গো হোল্ড থেকে যৌথ বাহিনীর অভিযানে ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত এই স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিমানবন্দরের ডিজিএফআই, এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক), কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এবং বিমানের নিজস্ব নিরাপত্তা বিভাগ যৌথভাবে এই অভিযান পরিচালনা করে।
এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এবং বিমানবন্দর থানার ইন্সপেক্টর (অপারেশনস) শরিফ হোসেন বলেন, “আমরা আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছি। আমরা ওই ফ্লাইটটি সরেজমিন পরিদর্শন করতে চাই।” তিনি আরও বলেন, “সংশ্লিষ্ট ফ্লাইটির পরিচালনার দায়িত্বে কারা ছিলেন তাদের তালিকাও আমরা চেয়েছি। ইঞ্জিনিয়ার সেকশন, ক্লিনার সেকশন, কেবিন ক্রু এবং পাইলট সবরাই তালিকা চাওয়া হয়েছে। মামলার তদন্তের স্বার্থে সবার সঙ্গে আমরা কথা বলবো।”
শরিফ হোসেন বলেন, “আলোচিত এই ঘটনার রহস্য উদঘাটনে সর্বোচ্চ তৎপরতা চালানো হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এই এয়ারলাইন্সকে ব্যবহার করে কারা স্বর্ণ চোরাচালানি করছে তাদের আমরা আইনের আওতায় আনবো।” এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “যে প্রক্রিয়ায় স্বর্ণগুলো আনা হয়েছে তাতে আমরা ভেতরের লোক জড়িত রয়েছে মর্মে আমরা সন্দেহ করি। তবে এখনও যেহেতু বিষয়টি তদন্তের মধ্যে রয়েছে সব কিছু খোলাসা না হওয়া পর্যন্ত কারও নাম বলা উচিত হবে না।” তিনি বলেন, “আমরা তালিকা পাওয়া মাত্রই জিজ্ঞাসাবাদের কার্যক্রম শুরু করবো। আশা করছি দ্রুতই তারা এগুলো আমাদের নিকট সরবরাহ করবেন।”
এর আগে গত ২৮ মার্চ রাতে দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশের আরেকটি ফ্লাইটের (বোয়িং ৭৮৭-৮, ফ্লাইট ইএ-৩৪৮) টয়লেটের প্যানেলের ভেতর থেকে প্রায় ৪৬ কোটি টাকা মূল্যের ১৮ কেজি (১৫৩টি বার) স্বর্ণ উদ্ধার করে এভসেক ও একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এই ঘটনায় বিমানের প্রকৌশল বিভাগের তিন মেকানিক ও হেলপার—নূর-ইসলাম, আবুল হোসেন এবং মিজানুর রহমানকে প্রাথমিকভাবে আটক করা হয়। তদন্তকারীরা জানান, নির্ধারিত ডিউটি শেষ হওয়ার পরও ওভারটাইম করার কারণে তাদের সন্দেহ হয় এবং পরে তাদের মোবাইল ফোনে স্বর্ণপাচার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আলামত মেলে। এই চক্রে বিমানের আরও অন্তত ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারী সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন।
বোর্ডিং গেটে জালিয়াতি ফাঁস: মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের চেষ্টা পণ্ড
স্বর্ণ চোরাচালানের পাশাপাশি বিমানবন্দরে বড় ধরনের মানবপাচারের একটি চক্রের তৎপরতাও প্রকাশ্যে এসেছে। গত ৪ জুলাই রাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা-মালয়েশিয়া রুটের বিজি-৩৮৬ ফ্লাইটে (বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার) ২৪৫ জন যাত্রীর ভ্রমণের কথা ছিল। কিন্তু বোর্ডিং গেটে পরীক্ষা করার সময় ৫ জন যাত্রীর ভিসার সঙ্গে পাসপোর্টের তথ্যের মারাত্মক অসঙ্গতি ধরা পড়ে এবং এভসেক তাদের অফলোড (আটকে দেওয়া) করে।
এই ৫ জন আটকে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই একই ফ্লাইটের আরও ৭১ জন যাত্রী বিমানে না উঠে তড়িঘড়ি করে বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, মানবপাচারকারী একটি চক্র ‘বডি কনট্রাক্ট’-এর মাধ্যমে এত বড় গ্রুপকে জাল ভিসায় মালয়েশিয়া পাচারের চেষ্টা করছিল। তবে আগে থেকে গোয়েন্দারা সতর্ক থাকায় এই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এই ঘটনার পেছনেও বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ কোনও চক্রের যোগসাজশ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কার্গো ভিলেজ থেকে ৪ হাজার কেজি মালামাল উধাও
বিমানবন্দরের কঠোর নিরাপত্তার মাঝেই বছরের শুরুতে ঘটে এক বিশাল শুল্ক ফাঁকির ঘটনা। বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ থেকে আমদানিকৃত প্রায় ৪ হাজার কেজি ফেব্রিক্স (কাপড়) কোনও প্রকার শুল্ক বা ট্যাক্স না দিয়েই সুকৌশলে বাইরে বের করে নিয়ে যায় একটি চক্র। এই ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর বিমানবন্দরের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও কাস্টমস চেকিংয়ের দুর্বলতা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন ওঠে।
কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ী মহলের বক্তব্য
তদন্তকারীরা বলছেন, যে স্থান থেকে স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে, সেখানে সাধারণ যাত্রীর প্রবেশ প্রায় অসম্ভব। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, বিমানের অভ্যন্তরে কর্মরত একাধিক ব্যক্তি এই পাচারের সঙ্গে জড়িত। পরিকল্পনা অনুযায়ী, যাত্রী নামার পর বিমানটি হ্যাঙ্গারে নেওয়া হলে সেখান থেকে স্বর্ণগুলো খালাস করার কথা ছিল বলেও প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা অনুসন্ধানের মাধ্যমে খুব দ্রুতই এই স্বর্ণ পাচার চক্রের পুরো নেটওয়ার্ক উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে এই ঘটনার মাধ্যমে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে এই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
বিমানবন্দরে অপরাধ চক্রের এই আকস্মিক সক্রিয়তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিমানবন্দর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ী খাইরুল কবীর ভুঁইয়া। তিনি বলেন, “দুটি ঘটনায় প্রায় ১০০ কোটি টাকার স্বর্ণ জব্দ করা কোনও সাধারণ বিষয় নয়। এর অর্থ হলো চোরাচালান চক্রটি কতটা শক্তিশালী ও বেপরোয়া। আবার জাল ভিসার মাধ্যমে মানবপাচারের ঘটনা দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক মহলে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। বিমানবন্দরের বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট হলেও অপরাধীদের কাছে তা যেন কোনও বিষয়ই মনে হচ্ছে না। তারা নিরাপত্তার মধ্যেই বারবার অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে। তাই নজরদারি ও তৎপরতা আরও বহুগুণ বাড়াতে হবে।”
সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বলেন, “গত কিছুদিনের যা ঘটনা তাতে করে তাদের তৎপরতা যে বেড়েছে আমরা বুঝতে পারছি। আমরা বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোকে এই ব্যাপারে সজাগ থাকতে বলেছি। আমাদের তৎপরতার কারণে এগুলো ধরা পড়ছে। আমরা সজাগ রয়েছি আরও সজাগ হবো।”



