ঢাকা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ৩১ বছর পূর্ণ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকটি করপোরেট ব্যাংকিংয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ওসমান এরশাদ ফয়েজ বলেছেন, করপোরেট ব্যাংকিং ও ফিনটেকের সমন্বয় করে গ্রাহকসেবা উন্নত করাই তাদের লক্ষ্য।
প্রযুক্তি ও করপোরেট ব্যাংকিংয়ের সমন্বয়
ওসমান এরশাদ ফয়েজ ১৯৯৩ সালে ঢাকায় আমেরিকান এক্সপ্রেসে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০৫ সাল পর্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বাংলাদেশ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এরপর প্রায় দুই দশক সিঙ্গাপুরসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কাজ করেন। বিদেশে কাজের অভিজ্ঞতা তাকে ব্যাংকিংয়ের প্রযুক্তিগত ভিত্তি নিয়ে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে।
ঢাকা ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে করপোরেট ব্যাংকিংয়ের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। তিনি বলেন, “ব্যাংকটির এই সক্ষমতাকে বদলে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন দেখি না। বরং আমার লক্ষ্য হলো, এই সক্ষমতা ধরে রেখে আরও উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করা, যাতে বিদ্যমান সম্পর্কগুলো আরও কার্যকর হয়, সেবার গতি বাড়ে এবং গ্রাহকসেবা সাশ্রয়ী হয়।”
প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের একমাত্র যৌক্তিকতা হলো, সেটি গ্রাহকের অভিজ্ঞতার উন্নতি ঘটাবে কি না। ইতিমধ্যে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে জেপি মর্গানের পেমেন্ট অবকাঠামো যুক্ত করা হয়েছে, যাতে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ তাদের পরিবারের কাছে আরও দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও দক্ষতার সঙ্গে পৌঁছাতে পারে।
তারল্য চাপ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা
দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও তারল্য চাপ মোকাবিলায় ঢাকা ব্যাংক প্রস্তুত বলে জানান ওসমান এরশাদ ফয়েজ। প্রায় দুই বছর দেশের ব্যাংকিং খাত তারল্য চাপে রয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি ব্যাংকের সংকট এই খাতে আস্থার ঘাটতি তৈরি করেছে। ফলে অনেক আমানতকারী তাঁদের অর্থ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ব্যাংকে স্থানান্তর করেছেন।
তিনি বলেন, “সংকটের সময় অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাংকে আমানত চলে যায়। ঢাকা ব্যাংক এই সংকটে আস্থার সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।” সাম্প্রতিক আর্থিক ফলাফলে সেই আস্থার প্রতিফলন দেখা গেছে। গত বছর নিট মুনাফায় প্রবৃদ্ধি ছিল ১১৯ শতাংশ। যেখানে অনেক ব্যাংকের জন্য টিকে থাকা প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে, সেখানে ঢাকা ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের জন্য নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।
তাদের প্রস্তুতি পরিকল্পিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। কারণ শৃঙ্খলার অভাবই সাম্প্রতিক সময়ে সংকটে পড়া অনেক ব্যাংকের অন্যতম দুর্বলতা ছিল। তারা আর্থিক স্থিতিপত্র পরিচালনা করে অনুকূল সময়ের কথা ভেবে নয়, বরং সম্ভাব্য প্রতিকূল পরিস্থিতি সামনে রেখে।
ব্যাংক খাতের সংস্কার ও একীভূতকরণ
ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণকে স্বাগত জানিয়েছেন ওসমান এরশাদ ফয়েজ। তিনি বলেন, “আমি এই উদ্যোগের পক্ষে। পরিস্থিতি যতই অস্বস্তিকর হোক না কেন, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত অপরিহার্য।”
যেসব ব্যাংক এখন একীভূতকরণের পথে যাচ্ছে, তাদের সংকট আকস্মিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, কিছু ব্যাংক কার্যত মালিকদের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছে। আমানতকারীদের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে ধীরে ধীরে এসব ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এসব ব্যাংককে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কাঠামোর মধ্যে আর ধরে রাখা সম্ভব নয়। একীভূতকরণ ও রেজোল্যুশন তাই সঠিক পথ।
খেলাপি ঋণ ও ঝুঁকি মূল্যায়ন
খেলাপি ঋণ নিয়ে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান যেভাবে সামনে এসেছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অনেক সময় আলোচনায় আসে না। সাম্প্রতিক বৃদ্ধি অনেকাংশেই আন্তর্জাতিক মান অনুসারে কঠোরভাবে ঋণ শ্রেণিকরণের ফল। বিশেষ করে তিন মাস মেয়াদোত্তীর্ণ হলেই ঋণকে নিম্নমান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার নিয়ম বাস্তবায়নের কারণে আগের লুকানো দুর্বলতাগুলো এখন দৃশ্যমান হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমি মনে করি, এই স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি। খেলাপি ঋণ হঠাৎ তৈরি হয় না, বরং মাসের পর মাস ব্যবসার নগদ প্রবাহে যে চাপ তৈরি হয়, সেখান থেকেই এটির সূচনা।” ঢাকা ব্যাংক ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে একক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে সীমা নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি জামানতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নগদ প্রবাহকেই প্রধান মূল্যায়ন মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করছে।
আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখা
এই মুহূর্তে ব্যাংকিং খাতে মূল প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু আমানত। সুদহার যখন ১০ শতাংশের কাছাকাছি, তখন প্রতিটি ব্যাংকের জন্য আমানত ধরে রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ব্যয়বহুল। সহজ পথ হলো উচ্চ সুদের মাধ্যমে আমানত আকর্ষণ করা। তবে ঢাকা ব্যাংক সচেতনভাবে সেই পথ অনুসরণ করছে না।
তাদের কৌশল হলো তুলনামূলকভাবে কম খরচের চলতি ও সঞ্চয়ী আমানতের ভিত্তি পুনর্গঠন করা, যাতে দীর্ঘ মেয়াদে তহবিল ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। ওসমান এরশাদ ফয়েজ বলেন, “আমার মনে হয়, আমানতকারীরা শেষ পর্যন্ত সেই ব্যাংকের দিকেই ঝোঁকেন, যেটিকে তাঁরা দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপদ ও স্থিতিশীল মনে করেন।”
প্রণোদনা প্যাকেজ ও অর্থনীতির গতি
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনীতির গতি ফেরাতে যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তা কার্যকর হবে বলে মনে করেন ওসমান এরশাদ ফয়েজ। তবে এসব প্রণোদনার কার্যকারিতা নির্ভর করে তহবিলের ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে, তার ওপর। নীতিগত সহায়তা একদিকে যেমন সুযোগ তৈরি করে, অন্যদিকে তার একটি মূল্যও রয়েছে।
তিনি বলেন, “একই সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারে তারল্য প্রবাহ বজায় রাখা—এই দুই উদ্দেশ্য কখনো কখনো পরস্পরবিরোধী হয়ে দাঁড়ায়। যদি প্রণোদনার অর্থ উৎপাদনশীল খাতে যায়, তাহলে তা অর্থনীতিকে সহায়তা করে। কিন্তু যদি স্বল্পমেয়াদি লাভের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না।”
আন্তর্জাতিক মানের গ্রাহকসেবা
আন্তর্জাতিক মানের গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতে ঢাকা ব্যাংক ব্যাংকিং প্রক্রিয়াকে সরল ও ডিজিটাল করছে। লক্ষ্য হলো এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে গ্রাহকের শাখা–নির্ভরতা কমে যাবে এবং অধিকাংশ সেবা ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে পারবেন।
তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি, যাতে কোনো তথ্য একবার প্রবেশ করানোর পর সেটি বারবার দিতে না হয়। আমরা চাই গ্রাহকসেবাকে একটি শৃঙ্খলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে, যেখানে প্রতিটি মিনিটের দক্ষতা ও নির্ভুলতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।”
করপোরেট ঋণের চাহিদা
বর্তমান পরিস্থিতিতেও করপোরেট ঋণের চাহিদা রয়েছে। তবে এটি আগের মতো একরৈখিক নয়, বরং দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে রয়েছে সুস্থ ও সক্ষম কোম্পানি, যারা এখনো বিনিয়োগ করছে, তবে অনেক বেশি সতর্কভাবে। অন্যদিকে কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের নগদ প্রবাহ নিয়ে রয়েছে চাপে। তাদের ক্ষেত্রে নতুন ঋণ সমস্যার সমাধান নয়, বরং এটি অনেক সময় সমস্যাকে কেবল পিছিয়ে দেয়।
ওসমান এরশাদ ফয়েজ বলেন, “আমরা পরিমাণের চেয়ে গুণগত মানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।”
পেশাদার ভারসাম্য ও সুশাসন
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে সুশাসন এখন আর কেবল নীতিগত আলোচনা নয়, এটি বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, যখন পর্ষদ প্রভাবশালী শেয়ারহোল্ডারদের প্রভাবে পরিচালিত হয় এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না, তখন ব্যাংকের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তিনি বলেন, “আমার দৃষ্টিতে, পর্ষদের কাজ হলো কৌশল নির্ধারণ, ঝুঁকি গ্রহণের সীমা নির্ধারণ ও নীতিগত দিকনির্দেশনা দেওয়া। অন্যদিকে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব হলো সেই কাঠামোর ভেতরে থেকে কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে পর্ষদের কাছে জবাবদিহি করা।”
আগামী তিন বছরের লক্ষ্য
আগামী তিন বছরে ঢাকা ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি ও সম্পদের মান নিয়ে ওসমান এরশাদ ফয়েজ বলেন, “আমরা বর্তমানে যে অবস্থানে আছি, সেটি একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে।” অগ্রাধিকারগুলো হলো: প্রথমত, প্রবৃদ্ধির আগে মানকে অগ্রাধিকার দেওয়া। দ্বিতীয়ত, খেলাপি ঋণের হারকে ব্যাংক খাতের গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ও টেকসইভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা। তৃতীয়ত, ঋণপোর্টফোলিওকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করা। চতুর্থত, মূলধন ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করা, যাতে তা বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপও মোকাবিলা করতে পারে।
তিনি বলেন, “আমরা চাই, আমাদের ভবিষ্যতে কোনো অপ্রত্যাশিত চমক থাকবে না, শুধু স্থিতিশীলতা থাকবে।”



