চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে গত আট থেকে ১০ বছর ধরে। এই চার প্রকল্পে গত মার্চ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। এরপরও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়নি। এমনকি মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই ডুবে গেছে নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এ অবস্থায় নগরের বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলেছেন, আসলে ১০ হাজার কোটি টাকা কোথায় ব্যয় গেলো।
তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই বিপুল অর্থ মূলত খাল পুনঃখনন, কালভার্ট/রেগুলেটর নির্মাণ এবং খালের দুই পাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ কাজে ব্যয় করা হয়েছে। এরপর নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে আরও দুটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। নতুন দুই প্রকল্পের খসড়া ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করবে।
এত অর্থ খরচের পরও সুফল না পাওয়ার কারণ
১০ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচের পরও সামান্য বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম তলিয়ে যাওয়ার পেছনে পরিকল্পনার গলদ ও সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। নথিপত্রে প্রকল্পের কাজ ৯০ শতাংশ সম্পন্ন বলা হলেও, বাস্তবে ১৪টি জলকপাট (স্লুইসগেট) নির্মাণ এবং অনেক খালের ভেতরের প্রতিবন্ধকতা দূর না হওয়ায় পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। এছাড়া অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও নালার আবর্জনা পরিষ্কারে ব্যর্থতার কারণে এই মেগাপ্রকল্পগুলোর সুফল মিলছে না।
জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান চার প্রকল্প
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমানে চারটি প্রকল্পের কাজ চলমান আছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) দুটি, সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পের মোট ব্যয় ১৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা। গত মার্চ পর্যন্ত এসব প্রকল্পে খরচ হয়েছে ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা।
সিডিএর দুটি বড় প্রকল্পের একটি বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনী অপরটি সিডিএ নিজেই বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্প দুটি হলো- চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন এবং চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্প।
এর মধ্যে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের ব্যয় আট হাজার ৬২৬ কোটি ৬২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। আর কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় দুই হাজার ৭৭৯ কোটি ৩৯ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। দুটি প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৭ সালের জুলাইয়ে। এর মধ্যে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ছয় বছর এবং কর্ণফুলী তীরবর্তী সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল তিন বছর।
প্রকল্প কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি জুন পর্যন্ত জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৯৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। প্রকল্পটির প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ছয় বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের ব্যয় একবার এবং সময় তিনবার বাড়ানো হয়েছে।
কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি প্রায় ৯৩ শতাংশ। এ প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল দুই হাজার ৩১০ কোটি টাকা। পরে দুই দফায় ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজার ৭৭৯ কোটি ৩৯ লাখ ৪৭ হাজার টাকায়। প্রকল্পটির সময়ও কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে।
বাকি দুই প্রকল্পের মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীনে চলমান ‘চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলমগ্নতা/জলাবদ্ধতা নিরসন ও নিষ্কাশন উন্নয়ন’ নামের প্রকল্পটির খরচ ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বাড়ইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত দুই দশমিক নয় কিলোমিটার দীর্ঘ বাড়ইপাড়া খাল খননে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এই খালটির কাজ ৯৫ শতাংশ শেষ হয়েছে।
নতুন দুই প্রকল্প
জলাবদ্ধতা নিরসনের চার প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে হলেও নগরের জলাবদ্ধ নিরসনের কোনও লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন না নগরবাসী। এরই মধ্যে জলাবদ্ধতা নিরসনে আরও দুটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। নতুন দুটি প্রকল্পের খসড়া ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা। দুটি প্রকল্পের মধ্যে একটি হচ্ছে নগরের ৩৬টি খালের রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার। প্রাথমিকভাবে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২২ কোটি টাকা।
সিডিএর নেওয়া জলাবদ্ধতা প্রকল্পের বাইরে থাকা খালগুলো নিয়ে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ২১টি খালের সংস্কার ও উন্নয়নে খরচ হবে ৩ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা।
দুই প্রকল্পে যা হবে
সিডিএর চলমান প্রকল্পের আওতায় থাকা ৩৬ খালের রক্ষণাবেক্ষণ, পুনঃখনন, বর্জ্য অপসারণ ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এই টাকায় খাল পুনঃখনন, পলি অপসারণ, বর্জ্য পরিবহন, যন্ত্রপাতি কেনা, খালের সীমানা সুরক্ষা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার কাজ থাকবে।
এই ৩৬ খালের মোট দৈর্ঘ্য ১১০ দশমিক ৩৩ কিলোমিটার। এসব খালের দৈর্ঘ্য আধা কিলোমিটার থেকে ছয় কিলোমিটার পর্যন্ত। কিছু খালের দৈর্ঘ্য এর বেশি রয়েছে। বর্তমানে খালগুলোর গড় গভীরতা শূন্য দশমিক ৮ থেকে আড়াই মিটার পর্যন্ত। প্রকল্প চলাকালে ১৬ লাখ ঘনমিটার পলি উত্তোলন করা হবে। প্রকল্পের প্রথম বছরে ১১২ কোটি টাকা খরচ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই ব্যয় আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু সাদাত মোহাম্মদ তৈয়ব।
৩৬ খালের বাইরে থাকা খালগুলোর মধ্যে ২১টি নিয়ে আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। খালগুলোর দৈর্ঘ্য ৩৪ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার। এ প্রকল্পের আওতায় ২১টি খালের উন্নয়ন ও সংস্কারকাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। এতে খালের দুই পাশে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ করা হবে। জমি অধিগ্রহণে ৫৮ কোটি টাকা, জোয়ার প্রতিরোধক ফটক (টাইডাল রেগুলেটর) ও পাম্প স্টেশন স্থাপনে ৫৭ কোটি, সেবা সংস্থার পাইপলাইন স্থানান্তর ও সড়কে ৩৭ কোটি, পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা ও জিআইএসের জন্য ৫৩ কোটি এবং সৌন্দর্যবর্ধনে ৭৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে।
সিডিএর কর্মকর্তারা বলছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের বড় প্রকল্প চললেও নগরের সব খাল সেই উদ্যোগের আওতায় আসেনি। নগরে ছোট-বড় ৭৪টি খাল আছে। এর মধ্যে ৬১টি খাল নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু বড় প্রকল্পে নেওয়া হয়েছে মাত্র ৩৬টি খাল। অর্থাৎ বাকি ৩৮টি খাল এখনও প্রকল্পের বাইরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব খাল অবহেলিত থাকলে প্রকল্পের পুরো সুফল নগরবাসী পাবে না।
চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার ও শাহরিয়ার খালেদ বলেন, চট্টগ্রাম নগরে এই ২১টি খালের বাইরে আরও খাল রয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসন করতে হলে অন্য খালগুলোও প্রকল্পের আওতায় আনতে হবে।
কতটুকু কাটলো জলাবদ্ধতা
চট্টগ্রামের পরিবেশ সাংবাদিক ও বেলার নেটওয়ার্ক মেম্বার আলীউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৯৬৮ সালের সিডিএর মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী চট্টগ্রামে ৭১টি খাল ছিল। সীতাকুণ্ডের কুমিরা রেলওয়ে স্টেশন থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত এসব খালের অবস্থান। চট্টগ্রাম বন্দর নির্মাণ, শিপইয়ার্ড নির্মাণসহ নানাভাবে দখলের কবলে পড়ে অনেক খালের অস্তিত্ব এখন নেই। নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচের পরও জলাবদ্ধতা কাটেনি। ৩০ শতাংশের মতো জলাবদ্ধতা কমলেও বাকি ৭০ শতাংশ রয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চলমান জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে ৩৬টি খাল অন্তভুক্ত থাকলেও বাকি খালগুলো সংস্কার থেকে বঞ্চিত। বাকি খালগুলো প্রকল্পের আওতায় এলে সুফল আরেকটু বাড়তে পারে।’
যা বলছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প নিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া বড় প্রকল্পটির মধ্যে থাকা ৩৬টি খাল সংস্কারের মধ্যে ইতিমধ্যে ৩৫টি খাল পুরোপুরি সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। বাকি খালটিরও বেশিরভাগ শেষ পর্যায়ে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারবো।’
তিনি আরও বলেন, ‘নগরের ৮০ লাখ বাসিন্দা যদি সচেতন না হয় কখনও জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব নয়। লোকজন সব ধরনের বর্জ্য খাল, নালা ও সড়কে ফেলছে। এগুলোর কারণে খাল-নালা ভরাট হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। সিডিএর অধীনে চলমান দুটি মেগাপ্রকল্পের কাজ শেষ হলেও প্রকল্পের বাইরে থাকা অনেক খাল সংস্কার না হওয়ায় এর পূর্ণ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে ওই খালগুলোর সংস্কারে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) উদ্যোগ নিয়েছে।’
মেয়র বলছেন জলাবদ্ধতা ৬০ শতাংশ কমেছে
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘নগরের জলাবদ্ধতা ৬০ শতাংশ কমে এসেছে। নগরীকে জলাবদ্ধতা মুক্ত করতে হলে খালগুলো সচল রাখা, দখলমুক্ত করা ও পরিষ্কার রাখা জরুরি। নতুন যে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে এগুলো বাস্তবায়ন হলে আশা করছি জলাবদ্ধতা কমে আসবে।’



