ভোলায় প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র চালুর আগেই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের ঋণের টাকায় নির্মিত এসব কেন্দ্র বর্তমানে কার্যত অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, পরিকল্পনার ত্রুটি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের কারণে কোটি কোটি টাকার স্থাপনাগুলো ভোলার জেলেদের কোনো কাজেই আসছে না।
মৎস্য অধিদপ্তরের ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ’ প্রকল্পের আওতায় ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের কাঠিরমাথা এবং লালমোহন উপজেলার লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের বুড়িরদোন এলাকায় দুটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয়নি
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল সামুদ্রিক মাছ আহরণের পর অপচয় রোধ, মাছের গুণগত মান সংরক্ষণ, আধুনিক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং স্থানীয় জেলে পল্লির সেবাসুবিধা নিশ্চিত করা। তবে বাস্তবে কেন্দ্র দুটিতে এখনো কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি।
রেজুলেশন সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালে কাঠিরমাথা মাছঘাট এলাকায় অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, সামুদ্রিক মাছ আহরণকারী জেলেরা যাতে ন্যায্যমূল্য পান এবং মাছ সংরক্ষণে আধুনিক সুবিধা পান, সে লক্ষ্যেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।
কাচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান, মাছ বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মনির হোসেনসহ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। জমির মালিকরাও অনাপত্তিপত্র দেন। মৎস্য কর্মকর্তারা সেখানে আধুনিক মাছঘাট, আড়ৎ, বরফকল, কোল্ডস্টোরেজ, স্যানিটেশনসহ বিভিন্ন সুবিধা গড়ে তোলার শর্ত লিপিবদ্ধ করেন। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুত সুবিধার অনেক কিছুই পাওয়া যায়নি।
কাঠিরমাথা কেন্দ্রের ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ
সম্প্রতি সরেজমিনে কাঠিরমাথা কেন্দ্র পরিদর্শনে দেখা যায়, নিম্নমানের টাইলস ব্যবহারের কারণে সিঁড়ির টাইলস ভেঙে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টার খসে পড়ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ইব্রাহীম জানান, সিঁড়ির পিলার ২৫ ফুট দেওয়ার কথা থাকলেও মাত্র ৫ ফুট দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে প্রকল্প কর্মকর্তারা আপত্তি তুললেও পরে তা সংশোধন করা হয়নি। সিঁড়ির ওপর বসানো প্লেট ভেঙে গেছে, সৌচাগার ও পানি নিষ্কাশনের পাইপ খুলে পড়েছে এবং পানির ট্যাংক চুঁইয়ে পানি পড়ছে। ভবনের নিচের অংশে খাল তৈরি হওয়ায় ভবিষ্যতে ধসে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে তিনি জানান।
অন্যান্য মৎস্য ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, প্রকল্পে বরফকল, হিমাগার, জেনারেটর, কমিউনিটি সেন্টার ও চারটি এসি বসানোর কথা থাকলেও অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া প্লাইওভার সড়কে টাইলস বসানো হয়নি, নদীতীরে গাইডওয়াল নির্মাণ করা হয়নি এবং জিআই পাইপের সুরক্ষা বেষ্টনীও দেওয়া হয়নি।
বুড়িরদোন কেন্দ্রের অনিয়ম
অন্যদিকে লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের বুড়িরদোন মাছঘাটে গিয়ে দেখা যায়, নদীতীরে পানির মধ্যে গাইডওয়াল দিয়ে ভিটিবালু ফেলে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। এটি বুড়িরদোন মাছঘাট নামে পরিচিত হলেও সেখানে মাছঘাটের তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। খালের মুখে কয়েকটি জেলে নৌকা দেখা গেলেও অবতরণ কেন্দ্রের সামনের খালে পানি নেই।
স্থানীয় জেলেদের মতে, খালটি চিকন করে কাটা হয়েছে এবং তলদেশে গভীরতাও কম। পরে ভাঙনরোধী ব্লক বসানো হলে নৌকা চলাচলের জায়গা থাকবে না। খরচ বাঁচাতে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এ স্থান নির্বাচন করেছে বলেও অভিযোগ তাদের।
স্থানীয় একাধিক জেলে জানান, বুড়িরদোন মাছঘাটে নিয়মিত সর্বোচ্চ ৪০টি নৌকা আসে এবং আড়তদার রয়েছেন মাত্র ৫-৬ জন। এখানকার বুড়িরদোন মাছঘাটের আড়তদার মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘এটি কী কারণে নির্মাণ হয়েছে বা কারা এর সুবিধা নেবে, তা কেউ জানে না। নির্মাণের সময় নিম্নমানের কাজের প্রতিবাদ করলে ঠিকাদারের লোকজন সাধারণ জেলেদের হুমকি-ধামকি দিত।’
মিজান মাঝি বলেন, ‘চালুর আগেই ভবনের বিভিন্ন অংশের টাইলস ভেঙে যাচ্ছে। নির্মাণে ভালো মানের ইট, বালু ও পাথর ব্যবহার করা হয়নি।’
ঠিকাদারের বক্তব্য
অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার শহিদুল ইসলাম বলেন, সদর উপজেলার অবতরণকেন্দ্রে এক কোটি টাকা এবং লালমোহনের কেন্দ্রে প্রায় তিন কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছেন, যার অনুমোদন পাননি। যন্ত্রপাতি না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বরাদ্দে যা ছিল, সবই দেওয়া হয়েছে।’
মৎস্য বিভাগের ব্যাখ্যা
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসাইন জানান, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে মৎস্য অধিদপ্তরের একটি বড় প্রকল্পের আওতায় ভবনগুলো নির্মিত হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত অক্টোবর মাসে, যদিও কাজ শেষ হয়নি। পরে নকশা অনুযায়ী চলতি বছরের মার্চে কাজ সম্পন্ন হয় এবং এপ্রিল মাসে পাঁচ সদস্যের কমিটির মাধ্যমে ভবন দুটি হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে এর বাইরে প্রকল্প সম্পর্কে ভোলা কার্যালয়ের কাছে কোনো তথ্য নেই বলে তিনি জানান।
মৎস্য বিভাগের প্রকৌশলী গৌতম চন্দ্র দে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘অনেকে অনেক কথা বলবে। এখানে আইস মিল ছিল, এটা ছিল, সেটা ছিল—বুঝছেন। বিল্ডিং তো আছে। এটা রিভাইজ হয়েছে, সংশোধিত হয়েছে।’ প্রকল্প ব্যয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা কত টাকার, তা বলতে পারব না, প্রকল্প পরিচালক বলতে পারবেন।’
প্রকল্পের উপপরিচালক আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘স্থান নির্বাচন অনেক বিষয় বিবেচনা করেই করা হয়েছে। এখন যেহেতু ভবন নির্মাণ হয়ে গেছে, তাই সবার সহযোগিতায় এটি চালু করা সম্ভব।’ জেলা মৎস্য কর্মকর্তার তথ্য না থাকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জেলা মৎস্য কর্মকর্তা যদি না জেনে থাকেন, তাহলে জেনে নেওয়া তার দায়িত্ব।’



