ঠাকুরগাঁওয়ের রতনের বৈদ্যুতিক বাইক: মাত্র ৫ টাকায় ১২০ কিলোমিটার পথ
রতনের বৈদ্যুতিক বাইক: ৫ টাকায় ১২০ কিলোমিটার

ঠাকুরগাঁওয়ের রতনের বৈদ্যুতিক বাইক: মাত্র ৫ টাকায় ১২০ কিলোমিটার পথ

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ লাইনের মাঝে, ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলের রতন মহন্ত একটি ব্যতিক্রমী সমাধান নিয়ে হাজির হয়েছেন। তার বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল কোনো পেট্রল বা মবিল ছাড়াই মাত্র ৫-৬ টাকার বিদ্যুৎ খরচে ১২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিচ্ছে, যা বর্তমান সংকটে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

রতনের উদ্ভাবনী যাত্রা

রাণীশংকৈল উপজেলা শহরের মহলবাড়ী এলাকার সুরেন মহন্তের ছেলে রতন মহন্ত পেশায় একজন অটোভ্যান মেকানিক। আগে তিনি সাইকেলের মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন এবং বর্তমানে কলেজ রোডে তার একটি যন্ত্রাংশের দোকান রয়েছে। ২০১৯ সালে শখ করে একটি পুরাতন ১০০ সিসির সুজুকি মোটরসাইকেল কেনার পর থেকে তিনি যান্ত্রিক ত্রুটি এবং তেলের উচ্চমূল্যের কারণে নাভিশ্বাস উঠতে শুরু করেন। স্থানীয় মেকানিকরা বারবার চেষ্টা করেও বাইকটি পুরোপুরি সচল করতে পারেননি, যা রতনকে একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে।

তেলের খরচ এবং মেরামতের বিরক্তি থেকে মুক্তি পেতে, রতন বাইকের ইঞ্জিন সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বাইকের ইঞ্জিনের স্থানে ১২ ভোল্টের চারটি ব্যাটারি এবং একটি অটোরিকশার শক্তিশালী মোটর স্থাপন করেন। ব্যাটারির সঙ্গে মোটরের সংযোগ ঘটিয়ে তিনি বাইকটিকে একটি সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক যানে রূপান্তরিত করেন, যা তার জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এনে দেয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সমাজের প্রতিক্রিয়া এবং সাশ্রয়ের হিসাব

শুরুতে যখন রতন ব্যাটারি লাগিয়ে বাইক চালানো শুরু করেন, তখন অনেকেই তাকে হাসাহাসি এবং ঠাট্টা-তামাশা করেছিল, এমনকি কিছু লোক এটিকে খেলনা বলে অভিহিত করেছিল। কিন্তু রতন দমে যাননি এবং তার অধ্যবসায় অবশেষে সফলতা এনে দেয়। এখন যখন তেলের অভাবে মানুষ পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিচ্ছে, তখন তারা রতনকে বাহবা দিচ্ছে এবং তার উদ্ভাবনকে প্রশংসা করছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রতনের এ উদ্ভাবনে সাশ্রয়ের হিসাবটি অত্যন্ত চমকপ্রদ। যেখানে একটি তেলচালিত বাইক ১২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে প্রায় ৪০০ টাকা খরচ করে, সেখানে রতনের বৈদ্যুতিক বাইকের খরচ হয় মাত্র ৫ থেকে ৬ টাকার বিদ্যুৎ। এতে পাম্পে গিয়ে তেল কেনার ভোগান্তি বা মবিল পরিবর্তনের বাড়তি ঝামেলা থেকে মুক্তি মিলছে, যা দৈনন্দিন জীবনে সুবিধা এবং অর্থনৈতিক সাশ্রয় নিশ্চিত করছে।

প্রতিবেশীদের মতামত এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

রতনের প্রতিবেশী আবু হানিফ জানান, রতনের এ বাইক বর্তমান জ্বালানি সংকটে একটি আশার আলো হিসেবে কাজ করছে। তিনি বলেন, "তেল কিনতে আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা যুদ্ধ করতে হয়। অথচ রতন অনায়াসে চলাফেরা করছেন এবং খরচও নামমাত্র। আমি নিজেও এখন আমার বাইকটিতে ব্যাটারি লাগানোর কথা ভাবছি।" এই মন্তব্য রতনের উদ্ভাবনের প্রভাব এবং সামাজিক স্বীকৃতিকে তুলে ধরে।

রতনের এই সাফল্য শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহনের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তার কাজ অন্যান্য মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করতে পারে, বিশেষ করে যারা উচ্চ তেলের মূল্য এবং দীর্ঘ লাইনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি চান।

সামগ্রিকভাবে, রতন মহন্তের বৈদ্যুতিক বাইক উদ্ভাবন শুধুমাত্র একটি স্থানীয় সাফল্য নয়, বরং এটি জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি দক্ষতা এবং টেকসই পরিবহন সমাধানের জন্য একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও উদ্ভাবনী প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করতে পারে।