ব্যবসায়ীদের প্রতি সন্দেহের মনোভাব ত্যাগের আহ্বান ফিকির
সব ব্যবসায়ীকে সন্দেহের চোখে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) জোরালো আহ্বান জানিয়েছে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি)। সংগঠনটির নেতারা স্পষ্ট করে বলেছেন, কয়েকজনের অনিয়ম বা অসাধুতার কারণে পুরো ব্যবসায়ী সমাজকে দায়ী করা মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়। বরং, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করেই রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের প্রবাহ ত্বরান্বিত করা সম্ভব বলে তারা উল্লেখ করেন।
প্রাক-বাজেট আলোচনায় ফিকির অবস্থান
সোমবার (৬ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আয়োজিত একটি প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় এসব মতামত তুলে ধরেন ফিকির সভাপতি রুপালী হক চৌধুরী। এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানসহ রাজস্ব বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং বাংলাদেশে কার্যরত বহুজাতিক কোম্পানির জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
রুপালী হক চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেন, “ব্যবসায়ী মানেই চোর—এই ধরনের ব্লেম গেম বা দোষারোপের খেলা থেকে আমাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। সরকার ও রাজস্ব কর্তৃপক্ষের উচিত আমাদের ওপর আস্থা রাখা। কিছু অসাধু ব্যক্তির জন্য সমগ্র ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে দায়ী করা কখনোই উচিত নয়।” তিনি আরও যোগ করেন, “সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে ব্যবসায়ী এবং রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে গভীর পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।”
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে কর সংস্কারের তাগিদ
ফিকির সভাপতি আরও বলেন, “দেশে বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় ও টেকসই করতে কর ব্যবস্থাকে অবশ্যই সহজ, স্বচ্ছ এবং পূর্বানুমানযোগ্য করে তুলতে হবে।” তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “নীতিমালায় ধারাবাহিকতা নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদী সিদ্ধান্ত নিতে নিরুৎসাহিত বোধ করেন, যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।”
সভায় অংশগ্রহণকারী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরাও কর ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কারের ওপর জোর দেন। তাদের মতে:
- বিদ্যমান ট্যাক্স নীতিমালাকে আরও সরল ও ডিজিটালভিত্তিক করতে হবে।
- করের আওতা বা ট্যাক্স বেইজ সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করা সম্ভব।
- এটি সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ বা ‘লেভেল প্লেইং ফিল্ড’ নিশ্চিত করবে।
তারা আরও উল্লেখ করেন, “রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির পাশাপাশি বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।” এ জন্য আগামী জাতীয় বাজেটে এমন নীতি সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, যা একদিকে রাজস্ব আহরণ বাড়াবে, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণকে উৎসাহিত করবে।
এনবিআর চেয়ারম্যানের প্রতিক্রিয়া ও ডিজিটাল উদ্যোগ
সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান কর প্রশাসনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “গত দেড় বছরে কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে এনবিআরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ডিজিটাল উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, “কর প্রশাসনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সেবা সহজলভ্য করা এবং করদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও উন্নত করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
তিনি আরও আশ্বাস দিয়ে বলেন, “ব্যবসায়ীদের মতামত ও সুপারিশগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং আগামী বাজেট প্রণয়নের সময় সেগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হবে।”
সংলাপের গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
প্রাক-বাজেট এ ধরনের আলোচনা সরকারের রাজস্ব নীতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সরকার ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ ও মতবিনিময় বাড়লে:
- রাজস্ব আহরণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
- বিনিয়োগ পরিবেশ আরও শক্তিশালী ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
- দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।
সর্বোপরি, ফিকির এই আহ্বান শুধুমাত্র একটি সংগঠনের মতামত নয়, বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠা সম্পর্কই রাজস্ব আহরণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির চাবিকাঠি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।



