বিমান ভাড়া আকাশছোঁয়া: যাত্রীরা হতাশ, এয়ারলাইনস আতঙ্কিত
জরুরি প্রয়োজনে মাসে তিন বার ঢাকা থেকে রাজশাহী যেতে হয়। আগে যে টাকা দিয়ে যাওয়া-আসা করতাম, এখন সেই টাকা দিয়ে এক দিকের টিকিটও হচ্ছে না। বিমানের ভাড়া ট্রেনের তুলনায় চার-পাঁচ গুণ বেশি হয়ে গেছে।—বলছিলেন আকাশপথের নিয়মিত যাত্রী শিক্ষক-গবেষক সৈয়দা বদরুন নেসা। একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন গৃহিণী লায়লা আরজুমান্দ হক। তিনি বলেন, ‘চিকিত্সার কারণে মাসে তিন থেকে চার দিন ঢাকা-রাজশাহী করতে হয় আমাকে। এখন যে হারে বিমানভাড়া বেড়েছে, তাতে শঙ্কিত আমি। আগে সাড়ে ৫ হাজার টাকায় টিকিট মিললেও এখন ৭ থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকার নিচে পাওয়া দুষ্কর। সরকারের উচিত, ফুয়েলের দাম কমিয়ে ভাড়া একটি নির্দিষ্ট সীমায় আনা।’
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে জেট ফুয়েলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা লেগেছে দেশের আকাশপথে। জ্বালানির দাম বাড়ার অজুহাতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় রুটেই টিকিটের দাম এখন আকাশচুম্বী। এতে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়েছে দেশীয় এভিয়েশন খাত। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে অভ্যন্তরীণ রুটে বিমানের প্রতিটি টিকিটের দাম গড়ে হাজার টাকা এবং আন্তর্জাতিক রুটে ৫ হাজার টাকারও বেশি বেড়েছে।
ভাড়ার এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ ও হতাশ যাত্রীরা। চড়া মূল্যের কারণে যাত্রীসংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে কমতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমনিতেই মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় প্রায় স্থবির বিমান চলাচল, তার ওপর জ্বালানি মূল্যের ধাক্কা পরিস্থিতি অনেক জটিল করে তুলেছে। বড় ধরনের লোকসানে পড়ার আশঙ্কা করছে দেশীয় এয়ারলাইনসগুলো।
টিকিটের দাম বৃদ্ধির চিত্র
এভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে মাত্র ১৬ দিনের ব্যবধানে জেট ফুয়েলের দাম লিটারপ্রতি বেড়েছে ১০৭ টাকা। এতে খাতটিতে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে শুধু এয়ারলাইনস নয়, পর্যটনশিল্প এবং নিয়মিত আকাশপথের যাত্রীরাও দিশাহারা হয়ে পড়েছেন।
অভ্যন্তরীণ রুটে জেট ফুয়েলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে টিকিটের ওপর। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার কিংবা সৈয়দপুর সব রুটেই টিকিটের ন্যূনতম দাম এখন সাধারণের নাগালের বাইরে। আগে যেখানে ঢাকা-সৈয়দপুর বা ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকায় টিকিট পাওয়া যেত, বর্তমানে সেখানে ন্যূনতম ৬ থেকে ৭ হাজার টাকার নিচে টিকিট মিলছে না। শেষ মুহূর্তের টিকিটের ক্ষেত্রে এই দাম ১০ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
- ঢাকা-রাজশাহী ও ঢাকা-যশোর রুটে টিকিটের দাম বেড়েছে ১ হাজার টাকা
- অন্য পাঁচটি রুটে বেড়েছে ১ হাজার ২০০ টাকা
- ঢাকা-কক্সবাজার রুটে পর্যটকদের জন্য যাতায়াত এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে
এয়ার অ্যাস্ট্রার প্রধান নির্বাহী ইমরান আসিফ বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম ২০-২২ দিনে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ভাড়া না বাড়ালে চলছিল না। আশা করি, এটি অস্থায়ী।’ বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, জেট ফুয়েলের দাম বাড়ার কারণে তাদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা জানিয়েছে, গত এক বছরে জ্বালানির দাম যে হারে বেড়েছে, সে অনুযায়ী ভাড়া সমন্বয় না করলে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।
আন্তর্জাতিক রুটেও একই চিত্র
ঢাকা থেকে কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, জেদ্দা, রিয়াদসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতে যাত্রীদের ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী—জেট ফুয়েলের দাম কলকাতায় প্রতি লিটার ০.৬২ ডলার, মাস্কাটে ০.৬০৩ ডলার, দুবাইতে ০.৫৮৭ ডলার, জেদ্দায় ০.৫৮১ ডলার এবং দোহায় ০.৫৮৪ ডলার।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে, বিশেষ করে ব্যাংককে ১.০৯৮ ডলার, সিংগাপুরে ০.৫৮৬ ডলার মূল্যে জেট ফুয়েল সরবরাহ করা হচ্ছে এয়ারলাইনসগুলোকে, যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম মূল্যে। এমনকি পাশের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধি অস্বাভাবিক বেশি। বর্তমান অবস্থায়ও ভারত ও নেপাল মূল্য অপরিবর্তিত রেখেছে। পাকিস্তানে ২৪.৪৯ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৮.৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৮০ শতাংশ।
ফ্লাইট বাতিল ও রাজস্ব ক্ষতি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বন্ধ হয়ে যায়। বাহরাইন, কুয়েত, দুবাই, কাতারসহ একাধিক দেশ তাদের আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করে। বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল এক বড় ধাক্কা। কারণ দেশের বিমান যোগাযোগের সিংহভাগই নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর—শ্রমিক, প্রবাসী, ব্যবসায়ী ও হজ-ওমরাহ যাত্রীদের প্রধান গন্তব্য এই অঞ্চল।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সহকারী পরিচালক জনসংযোগ মুহাম্মদ কাউছার মাহমুদ জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে ৮৯৪টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ফ্লাইট বাতিলে সরকারি রাজস্বও কমেছে। আন্তর্জাতিক যাত্রীপ্রতি যাত্রায় ভ্রমণ কর, নিরাপত্তা ফি, এক্সাইজ ডিউটিসহ গড়ে ৪৫-৫৫ ডলার কর দিয়ে থাকেন। ৮৯৪ ফ্লাইট বাতিল হলে আনুমানিক ১ লাখ ২৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারেননি। এর ফলে সরকারের ৬ মিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব আয় কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘বিমান খাতকে টিকিয়ে রাখতে সরকারকে বিশেষ ভর্তুকি বা করছাড়ের কথা ভাবতে হবে। বিশেষ করে, জেট ফুয়েলের ওপর বিদ্যমান ট্যাক্স ও ভ্যাট কমিয়ে দাম সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে। ডলার সংকটের এই সময়ে এয়ারলাইনসগুলোর জন্য বিশেষ এলসি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি ও অন্যান্য চার্জ পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তেলের দাম কমিয়ে ভাড়া কমাতেই হবে, না হলে যাত্রীদের পাশাপাশি এয়ারলাইনস মালিকরাও বিপাকে পড়বেন।’
এ প্রসঙ্গে সরকারি উদ্যোগ কেমন—জানতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘আজ (গতকাল) প্রথম অফিস করলাম। এ বিষয়ে পরে মন্তব্য করব।’
এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) সাধারণ সম্পাদক ও নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ালে ভাড়া বাড়বে, এটা স্বাভাবিক। আমরা সেটা করেছি। তবে তা সাময়িক। আমরা সরকারের সঙ্গে বসব। তেলের দামটা যেন একটা যৌক্তিক পর্যায়ে আনা হয়, সেটা আমরা বলব।’



