বাংলাদেশে বিওয়াইডির যাত্রা: শুরু থেকে লক্ষ্যের দিকে
বাংলাদেশে বিওয়াইডির যাত্রা শুরু হয়েছে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে কাজ শুরু করে এবং মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে। ইমতিয়াজ নওশেরের মতে, শুরুতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিউ এনার্জি ভেহিকেল বা এনইভি সম্পর্কে মানুষকে সঠিক ধারণা দেওয়া। অনেকে ইলেকট্রিক ভেহিকেল বুঝলেও এনইভি কী, তা অনেকেরই অজানা ছিল। এ ছাড়া চীনা পণ্যের প্রতি বিদ্যমান নেতিবাচক ধারণা কাটানোও ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
ক্যাটাগরি বিল্ডিং এবং ব্র্যান্ড নলেজ
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় বিওয়াইডি দুটি প্রধান কাজ করেছে: ক্যাটাগরি বিল্ড করা এবং ব্র্যান্ড নলেজ দেওয়া। তাদের সিল এবং অ্যাটো ৩ মডেলের মাধ্যমে প্রথম বড় সাফল্য অর্জিত হয়েছে, যা বাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সাহায্য করেছে।
আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের লক্ষ্য
ইমতিয়াজ নওশের জানান, বিওয়াইডির লক্ষ্য হলো আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের অটোমোটিভ বাজারের শীর্ষস্থানে পৌঁছানো। তাদের বিশ্বাস, এই সময়ের মধ্যে মানুষের আগ্রহ হাইব্রিড এবং ইলেকট্রিক ভেহিকেলের দিকে আমূল বদলে যাবে। বিওয়াইডি একটি ভার্টিক্যালি ইন্টিগ্রেটেড কোম্পানি হওয়ায়, তারা নিজেরাই সব যন্ত্রাংশ তৈরি করে, যা প্রতিযোগীদের চেয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো মানের পণ্য দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ২০২৬ সালকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যখন তারা সব শ্রেণির গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
রিকন্ডিশন এবং জাপানি গাড়ির আধিপত্যের মুখে চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে রিকন্ডিশন এবং জাপানি গাড়ির দীর্ঘদিনের আধিপত্য থাকলেও, ইমতিয়াজ নওশের মনে করেন চ্যালেঞ্জ আছে কিন্তু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষ এখন অনেক সচেতন এবং সহজেই তথ্য যাচাই করতে পারছেন। তাদের শোরুমের ফুটফল এবং টেস্ট ড্রাইভের সংখ্যা প্রতি মাসেই বাড়ছে। বিওয়াইডি টয়োটা এলিয়ন, প্রিমিও বা অ্যাক্সিওর মতো জনপ্রিয় সেগমেন্ট এবং এন্ট্রি লেভেল এসইউভি বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা করছে।
ইভি বেছে নেওয়ার কারণ: খরচ এবং প্রযুক্তি
একজন ক্রেতা কেন নিয়মিত জ্বালানিচালিত গাড়ির বদলে ইভি বা বিওয়াইডি বেছে নেবেন? ইমতিয়াজ নওশেরের মতে, প্রধান কারণ হলো খরচ এবং প্রযুক্তি। একটি সাধারণ আইসিই গাড়িতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয় ১৫-১৭ টাকা, সেখানে বিওয়াইডির অ্যাটো ৩-এ খরচ মাত্র ২.১৫ টাকা। এ ছাড়া তারা আট বছরের ব্যাটারি রিপ্লেসমেন্ট ওয়ারেন্টি দিচ্ছে, যা কোনো সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়িতে পাওয়া সম্ভব নয়। বিওয়াইডির ‘ব্লেড ব্যাটারি’ বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ ব্যাটারি হিসেবে স্বীকৃত, এবং তাদের প্যাটেন্টের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা প্রযুক্তিতে তাদের অগ্রগতির প্রমাণ।
চার্জিং অবকাঠামো: মানসিক ভয় কাটানোর উদ্যোগ
চার্জিং অবকাঠামো নিয়ে গ্রাহকদের মনে ভয় কাজ করলেও, ইমতিয়াজ নওশের বলছেন এটি অনেকটাই মানসিক। তাদের গাড়িগুলো এক চার্জে ৪০০ থেকে ৫৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলে, যা সাধারণ ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত। তারা প্রতিটি গাড়ির সঙ্গে ফ্রি হোম চার্জার দিচ্ছে এবং দেশজুড়ে চার্জিং নেটওয়ার্ক তৈরির কাজ চলছে। ২০২৬ সালের মধ্যে প্রধান সড়কগুলো চার্জিং সুবিধার আওতায় আসবে, এমনকি বিশেষ প্রয়োজনে যেকোনো থ্রি-পিন সকেট দিয়েও গাড়ি চার্জ করা সম্ভব হবে।
পুনঃ বিক্রয়মূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তা
পুনঃ বিক্রয়মূল্য নিয়ে মানুষের দুশ্চিন্তা থাকলেও, ইমতিয়াজ নওশেরের মতে, রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুনঃ বিক্রয়মূল্যও বাড়বে। বিওয়াইডি প্রথম বছরেই ৫০০-এর বেশি গাড়ি বিক্রি করেছে, যা এই বাজারে একটি রেকর্ড। গাড়ির চাহিদা এত বেশি যে, অনেক সময় বর্তমান মালিকেরা বিক্রি করার আগে থেকেই ক্রেতা পেয়ে যাচ্ছেন। একটি ব্র্যান্ডনিউ গাড়ি সাধারণত চার বছর ব্যবহার করা হয়, তাই রিসেল নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই বলে তিনি মনে করেন।
তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছানো
তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে বিওয়াইডি ডিজিটালনির্ভর কাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ইউথ অ্যাপ্রেন্টিসশিপ প্রোগ্রাম’ চালু করা হয়েছে, এবং চালক ও স্থানীয় টেকনিশিয়ানদের আধুনিক প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি একটি ক্রস-কান্ট্রি ড্রাইভে তাদের প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়িটি এক চার্জ এবং এক ফুল ট্যাংকে ১২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। ইমতিয়াজ নওশেরের বিশ্বাস, মানুষ সরাসরি গাড়ি চালিয়ে দেখলে বিওয়াইডির প্রযুক্তির প্রেমে পড়বেন।
বিশেষ টেকনোলজি: আই-ট্যাক ফিচার
ইমতিয়াজ নওশের ব্যক্তিগতভাবে বিওয়াইডির ‘আই-ট্যাক’ ফিচারটির প্রশংসা করেন। এই ইন্টেলিজেন্ট টর্ক অ্যাডাপ্টেশন কন্ট্রোল সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাস্তার অবস্থা বুঝে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে, এমনকি হাইস্পিড ড্রাইভিংয়েও গাড়িটি মাটির সঙ্গে কামড়ে লেগে থাকে। এটি মূলত রেসিং কারের ফিচার, যা বিওয়াইডির অ্যাটো-৩–এর মতো ভারী গাড়িতেও অসাধারণ স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।
চীনা প্রযুক্তি নিয়ে দ্বিধা দূর করার বার্তা
যারা চীনা প্রযুক্তির গাড়ি নিতে দ্বিধাবোধ করেন, তাদের উদ্দেশে ইমতিয়াজ নওশেরের বার্তা হলো: বিশ্ব এখন বদলে গেছে এবং বিওয়াইডি বিশ্বের এক নম্বর নিউ এনার্জি ভেহিকেল নির্মাতা। অ্যাপল বা টেসলার মতো কোম্পানিগুলোও অনেক ক্ষেত্রে চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে। বিওয়াইডি শুধু গাড়ি বিক্রি করছে না, একটি সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম তৈরি করছে। তিনি মানুষকে শোরুমে এসে গাড়িটি চালিয়ে দেখার আহ্বান জানান, যাতে তাদের দীর্ঘদিনের ধারণা বদলে যায়। বিওয়াইডির গাড়ি কেবল একটি গাড়ি নয়, এটি ভবিষ্যতের একটি স্মার্ট ডিভাইস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



