হেলমেট বাজারে ত্রুটি: আমদানিতে শুল্ক ফাঁকি, বিক্রিতে চড়া দাম, মানহীন পণ্য
ঢাকার মিরপুরের ৬০ ফুট সড়কে একটি মানসম্মত হেলমেট কিনতে গিয়ে চমকে উঠতে হয়। স্পেনের সুপরিচিত এম টি ব্র্যান্ডের একটি হেলমেটের দাম বিক্রেতা চাইলেন ৭ হাজার টাকা। তিনি আরও জানান, বেশ ভালো মানের হেলমেটের দাম ২০ হাজার টাকার বেশি হতে পারে, এমনকি ৮০ হাজার টাকার হেলমেটও বাজারে পাওয়া যায়। কিন্তু কৌতূহল জাগে, মোটামুটি ভালো হেলমেটের এত উচ্চ মূল্য কেন? জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এম টি ব্র্যান্ডের হেলমেট একটি কোম্পানি আমদানি করছে প্রতিটি মাত্র ২ মার্কিন ডলার দাম দেখিয়ে, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৫০ টাকা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেন, হেলমেট আমদানিতে শুল্ক ফাঁকি দিতে আন্ডার ইনভয়েসিং বা দাম কম দেখিয়ে আমদানি করা হচ্ছে।
মানসম্মত হেলমেটের গুরুত্ব ও বাজারের অনিয়ম
মানসম্মত হেলমেট যেখানে মানুষের প্রাণ বাঁচায়, সেখানে বাংলাদেশের হেলমেটের বাজার তিন ধরনের অনিয়মে ভরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০২৩ সালে প্রকাশিত ‘সড়ক নিরাপত্তা নির্দেশিকা’ অনুযায়ী, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হতাহতের বড় কারণ মাথায় আঘাত। মানসম্মত হেলমেট পরলে মৃত্যুঝুঁকি ছয় গুণের বেশি কমে এবং মস্তিষ্কে আঘাতের ঝুঁকি ৭৪ শতাংশ হ্রাস পায়। কিন্তু বাংলাদেশে এই গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সরঞ্জামের বাজার নানা অনিয়মে জর্জরিত।
হেলমেট বাজারের তিন প্রধান অনিয়ম
প্রথমত, বাজারে বিক্রি হওয়া হেলমেটের বড় অংশ মানসম্মত নয়। ১৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যেও হেলমেট পাওয়া যায়, যা আসলে প্লাস্টিকের টুপি মাত্র। দ্বিতীয়ত, হেলমেট খুব কম দামে আমদানি দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়। এতে কর ফাঁকি না দেওয়া আমদানিকারক এবং দেশীয় উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, কিন্তু বাজারে হেলমেট বিক্রি হয় চড়া দামে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) হেলমেটের মান পরীক্ষা করার কথা থাকলেও, বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন ছাড়া অহরহ হেলমেট বিক্রি হচ্ছে।
আমদানিতে শুল্ক ফাঁকি ও বাজারে চড়া দাম
এনবিআর থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ৯ লাখ ৭১ হাজার হেলমেট আমদানি করা হয়েছে, এবং ২০২৫ সালে আমদানি হয়েছে ১০ লাখ ১৯ হাজার হেলমেট। এর বড় অংশ আসে ভারত ও চীন থেকে। কাস্টমসের তথ্যে দেখা যায়, ভারতের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ভেগা, স্টিলবার্ড, স্টাডস ও গ্লাইডার্সের হেলমেট আমদানির সময় প্রতিটির দাম ২ থেকে ৩ ডলার (২৫০ থেকে ৩৭০ টাকা) দেখানো হচ্ছে। কিন্তু দেশের খুচরা দোকানে একই হেলমেট বিক্রি হয় ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায়। হেলমেট আমদানিতে মোট শুল্ক–কর ৫৮ শতাংশ, এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুল্ক ফাঁকি দিতেই হেলমেটের দাম খুব কম দেখানো হয়।
দেশীয় উদ্যোক্তাদের ক্ষতি ও তদারকির অভাব
বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, শহরে মোটরসাইকেলচালকদের মধ্যে হেলমেট পরার প্রবণতা দেখা গেলেও, আরোহীর ক্ষেত্রে তা অনেক সময় থাকে না। জেলা ও উপজেলায় হেলমেট পরার প্রবণতা আরও কম। তিনি উল্লেখ করেন, চালকেরা যে হেলমেট পরেন, তা প্রায়ই প্লাস্টিকের ক্যাপ বা টুপি মাত্র। শুল্ক ফাঁকির কারণে দেশীয় উদ্যোক্তারাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন। ডিউরেবল প্লাস্টিক লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌকিরুল ইসলাম জানান, আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের কারণে তাঁরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
বিএসটিআইয়ের ভূমিকা ও মানহীন হেলমেট বিক্রি
বিএসটিআইয়ের পরিচালক (সিএম) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, হেলমেটের মান পরীক্ষার জন্য বিএসটিআই ৮ কোটি টাকায় একটি পরীক্ষাগার করেছে, যা গত বছরের শেষ দিকে চালু হয়েছে। বৈধভাবে আমদানি করা হেলমেট বিএসটিআইয়ের ছাড়পত্র ছাড়া বাজারে ছাড়ার সুযোগ নেই। কিন্তু বাজারে স্বল্প দামে মানহীন হেলমেট বিক্রি হচ্ছে, এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মানচিহ্ন (যেমন ইসিই বা ডট) নকল করা হচ্ছে, যা যাচাই করা কঠিন।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও সমাধানের পথ
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬৬ লাখ, যার মধ্যে প্রায় ৪৮ লাখ ৭১ হাজার মোটরসাইকেল রয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৭২ জন নিহত হন, যা সড়কে মোট মৃত্যুর ৩৬ শতাংশ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, চার চাকার যানের চেয়ে দুই চাকার যানের চালক ও আরোহীর ঝুঁকি অনেক বেশি। তিনি জোর দেন, মানসম্মত হেলমেট সহজলভ্য করতে হবে এবং তা পরা নিশ্চিত করতে হবে। হেলমেটের মান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পরীক্ষা এবং বাজারে তদারকি বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।



