এসএমই ফাউন্ডেশনের ২০তম বার্ষিক সভা: ৪৬ হাজার উদ্যোক্তা পেয়েছেন সরাসরি সুবিধা
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত পর্যটন ভবনে এসএমই ফাউন্ডেশনের ২০তম বার্ষিক সাধারণ সভা সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় প্রকাশ করা হয় যে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি সুবিধা পেয়েছেন মোট ৪৬ হাজার ৪৫৯ জন মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা। সোমবার, ৩০ মার্চ তারিখে আয়োজিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ও শিল্পসচিব মো. ওবায়দুর রহমান।
সুবিধাভোগী উদ্যোক্তাদের লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণ
সভাপতি মো. ওবায়দুর রহমান জানান, সুবিধাভোগী উদ্যোক্তাদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ২৩ হাজার ৫৫০ জন, নারী উদ্যোক্তা রয়েছেন ২২ হাজার ৮৩৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের উদ্যোক্তা ৭০ জন। এই পরিসংখ্যানটি নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ফাউন্ডেশনের ভূমিকার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের কর্মসূচির বিস্তারিত বিবরণ
সভায় স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজিম হাসান সাত্তার। অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাস্তবায়িত কর্মসূচির বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরেন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী। তিনি উল্লেখ করেন যে, গত অর্থবছরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে এসএমই ফাউন্ডেশন মোট ৬৫৬টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে।
ঋণ বিতরণ ও আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ: এসব কর্মসূচির মধ্যে স্বল্পসুদে প্রায় সাড়ে তিন হাজার উদ্যোক্তার মধ্যে ৩৭৩ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি, সিলেট, বগুড়া, বরিশাল ও রংপুরে বিভাগীয় এসএমই পণ্য মেলার আয়োজন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চীনের কুনমিং ও সাংহাই, তুরস্কের ইস্তাম্বুল এবং যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় দেশীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
দেশীয় মেলা ও বাজেট প্রস্তাব: দেশীয় পর্যায়ে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা, পরিবেশ মেলা এবং বিজয় মেলা ২০২৪-এ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এছাড়া, এসএমই খাতের উন্নয়নে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে ১৪১টি প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে ফাউন্ডেশন।
প্রশিক্ষণ, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও পুরস্কার
একই সময়ে নয়টি প্রতিষ্ঠানের আইএসও ২২০০০ সনদ অর্জনে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। উদ্যোক্তা-ব্যাংকার মতবিনিময় সভা, ঋণ ম্যাচমেকিং কর্মসূচি, ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি কর্মশালা এবং বিভিন্ন এসএমই ক্লাস্টারে পণ্য প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
ফাউন্ডেশনের সেবা সহজলভ্য করতে ‘এসএমইএফ সার্ভিস প্ল্যাটফর্ম’ নামে একটি অনলাইন নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ‘বিজনেস পিচ কম্পিটিশন’ আয়োজন করে তিনজন বিজয়ীকে মোট ১২ হাজার ডলার সমমূল্যের পুরস্কার প্রদান করা হয়। একইসঙ্গে করপোরেট ক্রেতাদের সঙ্গে নারী উদ্যোক্তাদের সংযোগ তৈরিতে ম্যাচমেকিং কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে।
দক্ষতা উন্নয়ন ও গণমাধ্যম সম্পৃক্ততা
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে ১৪৩টি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এসএমই খাতের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরতে গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে পাঁচটি এসএমই ক্লাস্টার পরিদর্শনের আয়োজন করা হয়। প্রথমবারের মতো গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের জন্য ‘এসএমই ফাউন্ডেশন-ইআরএফ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ প্রদান করা হয়েছে।
সভার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
সভায় পরিচালক পর্ষদের প্রতিবেদন উপস্থাপন ও গ্রহণ, নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী এবং নিরীক্ষকের প্রতিবেদন অনুমোদন করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটও অনুমোদিত হয়েছে। সাধারণ পর্ষদের সদস্যরা তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতি এগিয়ে নিতে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে এসএমই ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে তারা এমএসএমই খাতকে আরও এগিয়ে নিতে কয়েকটি দাবি উপস্থাপন করেন:
- এসএমই ফাউন্ডেশনকে সমন্বয়কারী সংস্থা হিসেবে ঘোষণা করা
- এই খাতের জন্য জাতীয় বাজেটে প্রতি বছর সুনির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা
এসএমই খাতের জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান
বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশই কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) প্রতিষ্ঠান। শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ এই খাতে, যেখানে প্রায় ৩ কোটির বেশি মানুষ কর্মরত রয়েছেন।
২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এসএমই ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কর্মসূচির সুবিধাভোগী হয়েছেন প্রায় ২০ লাখ উদ্যোক্তা, যাদের প্রায় ৬০ শতাংশই নারী উদ্যোক্তা। এই তথ্যগুলো ফাউন্ডেশনের টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তিতে অবদানের সাক্ষ্য বহন করছে।



