৩৯ বছরের পান ব্যবসায়ী সিদ্দিক কবিরাজ: এক খিলির দাম ১৫৭৫ টাকা, মেলায় দুই দিনে অর্ধলক্ষ টাকা বিক্রি
রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী বাঘা ঈদ মেলায় দরগা শরিফের গেটের সামনে সিদ্দিক কবিরাজের পানের দোকানটি দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তার দোকানে একটি খিলি পান বিক্রির তালিকায় সর্বোচ্চ দাম ১ হাজার ৫৭৫ টাকা এবং সর্বনিম্ন দাম মাত্র ১০ টাকা। সিদ্দিক কবিরাজ ৩৯ বছর ধরে পান ব্যবসা করলেও এই ঐতিহ্যবাহী ঈদ মেলায় তিনি ৩১ বছর যাবত পানের খিলি বিক্রি করে আসছেন।
ব্যবসার শুরু ও বর্তমান অবস্থা
সিদ্দিক কবিরাজ (৫৭) নাটোরের লালপুর উপজেলার জয়রামপুর-বেড়িলাবাড়ি গ্রামের মৃত গরিবউল্লার ছেলে। হরেক রকম জর্দা ও মসলা দিয়ে তিনি তৈরি করেন বিভিন্ন স্বাদের পান। বাহারি এই পান খেতে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন তার দোকানে আসেন। অভাব-অনটন তাকে পান বিক্রিতে বাধ্য করেছিল। বড় ধরনের ব্যবসা করতে মোটা অংকের পুঁজির প্রয়োজন ছিল, যা তার সাধ্যের বাইরে ছিল। ১৯৮৭ সালে স্বল্প পুঁজি নিয়ে তিনি এই খিলি পান বিক্রি শুরু করেন।
দীর্ঘ ৩৯ বছর পানের দোকানদারি করে সিদ্দিক কবিরাজ এখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। এই মেলায় মাত্র দুই দিনে তিনি প্রায় অর্ধলক্ষাধিক টাকার খিলি পান বিক্রি করেছেন। একটি খিলি ভালবাসার পান ৩৩৫ টাকায় বিক্রি করেছেন তিনি। এই মাসে তার প্রায় লক্ষাধিক টাকার পান বিক্রি হয়েছে, যার মধ্যে মেলায় দুই দিনের বিক্রিই অর্ধলক্ষাধিক টাকা। বিভিন্ন পণ্যের দামসহ যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মাসে তার ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় হয়।
পারিবারিক জীবন ও শিক্ষার স্বপ্ন
পান বিক্রি করেই সিদ্দিক কবিরাজ তার সন্তানদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। তার মেয়ে শিখা খাতুন অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে শান্ত হোসেন স্থানীয় স্কুল থেকে এবার এসএসসি পাশ করেছে। সিদ্দিক কবিরাজ নিজে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বেশি লেখাপড়া করতে পারেননি, কিন্তু টাকার অভাবে যাতে ছেলের পড়াশোনা বন্ধ না হয়ে যায়, সে ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট সচেতন। মেয়ের মতো ছেলেকেও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন এই পান ব্যবসায়ী।
পানের মূল্য তালিকা ও গ্রাহক প্রতিক্রিয়া
সিদ্দিক কবিরাজের দোকানে পানের মূল্যের তালিকায় রয়েছে:
- নবাব পান: ১৫৭৫ টাকা
- জমিদার পান: ১০৫০ টাকা
- নাটোরের বনলতা পান: ১৫৭৫ টাকা
- আয়ুর্বেদিক পান: ৯৯৫ টাকা
- বিয়াই-বিয়ান পান: ৮৮৫ টাকা
- শালি-দুলাভাই পান: ৭৭৫ টাকা
- হাসি-খুশি পান: ৫৫৫ টাকা
- নতুন বাবুর হাতের পান: ৪৪৫ টাকা
- ভালো বাসার পান: ৩৩৫ টাকা
- বন্ধু-বান্ধবীর পান: ২৫ টাকা
- জনতার পান: ১০ টাকা
সোমবার (২২ মার্চ) দৌলতপুর থেকে মেলায় ঘুরতে আসা এক ব্যক্তি ৩৩৫ টাকা মূল্যের একটি ভালবাসার পান কিনেছেন। তিনি বলেন, "এর আগেও তার কাছে থেকে পান খেয়েছি। তার পান খেলে মনে হয় মুখ থেকে পান ফুরোচ্ছে না। খেতে খুব সুস্বাদু।"
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও ব্যবসার ধরন
বাঘা প্রেস ক্লাবের আহ্বায়ক আবদুল লতিফ মিঞা বলেন, "দীর্ঘ দিন থেকে এই মেলায় পান বিক্রি করে আসছেন সিদ্দিক কবিরাজ। তার পান খাওয়ার জন্য মানুষ কিছু সময় লাইন নিয়ে থাকেন। বিক্রিও ভালো হয়।" সিদ্দিক কবিরাজ নিজে বলেন, "আমি দেশের বিভিন্ন জেলায় পান বিক্রি করে বেড়াই। স্থানীয়ভাবে ব্যবসা করি না। ভ্রাম্যমাণ হিসেবে এ ব্যবসা করে আসছি। যেখানে বড় বড় মেলা বা অনুষ্ঠান হয় সেখানে যাই। এভাবে দীর্ঘ ৩৯ বছর চলছে।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমার সাত ভাইবোনের মধ্যে আমি বড়। বাবা ১২ বছর আগে মারা গেছেন। বর্তমানে বৃদ্ধ মা সহ ৫ সদস্যের পরিবার পরিচালনা করতে কোনো বেগ পেতে হয় না।"
বাঘা মেলার ঐতিহাসিক পটভূমি
প্রায় ৫০০ বছর আগে ১৫২৩-২৪ সালে (৯৩০ হিজরি) হুসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন হুসেন শাহের পুত্র সুলতান নুসরাত শাহ, হযরত আব্বাসী এবং তার বংশধর হযরত শাহ মোয়াজ্জেম ওরফে শাহদৌলা (র.), তার পুত্র হযরত আবদুল হামিদ দানিশমন্দ (র.) এবং জহর খাকীসহ পাঁচজন সঙ্গী ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে পদ্মা নদীর তীরবর্তী বাঘায় বসবাস শুরু করেন। তাদের চরিত্র, ব্যবহার ও আত্মিক শক্তিতে আকৃষ্ট হয়ে এলাকার বহু মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাদের স্মরণে ওরসকে কেন্দ্র করে ঈদের দিন থেকে বাঘা ওয়াকফ এস্টেটের বিশাল এলাকাজুড়ে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।



