ঈদযাত্রায় ভোগান্তির ত্রিমুখী আঘাত: অতিরিক্ত ভাড়া, রেল দুর্ঘটনা ও লঞ্চে প্রাণহানি
ঈদযাত্রায় ভোগান্তি: অতিরিক্ত ভাড়া, দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি

ঈদযাত্রায় ভোগান্তির ত্রিমুখী আঘাত: অতিরিক্ত ভাড়া, রেল দুর্ঘটনা ও লঞ্চে প্রাণহানি

পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগমনে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে বাড়ি ফেরার মিছিল। শ্রমজীবী থেকে উচ্চবিত্ত, সব শ্রেণির মানুষ নগরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে শান্তির সন্ধানে ছুটছেন নিজ গৃহের দিকে। তবে দীর্ঘ ছুটির এই সময়ে যাত্রীদের জন্য ঈদের আনন্দ ম্লান করে দিচ্ছে ভোগান্তির একের পর এক চিত্র। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, রেল দুর্ঘটনা ও লঞ্চে প্রাণহানির মতো ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে বাড়িয়ে তুলছে।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায়: সরকারি দাবি বনাম বাস্তবতা

বাংলাদেশের পরিবহন খাতে ঈদকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের একটি নীরব প্রথা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দাবি অনুযায়ী, এবারের পরিস্থিতি গত ২০ বছরের রেকর্ড ভাঙতে চলেছে। সংগঠনের তথ্যমতে, দেশের প্রায় ৮৭ শতাংশ বাস ও মিনিবাসে এখন অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। সমীক্ষা অনুসারে, এই এক মৌসুমে যাত্রীদের পকেট থেকে বাড়তি প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা জোরপূর্বক হাতিয়ে নেওয়া হবে।

লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজের ফেসবুক পোস্টে বেশ কয়েকজন যাত্রী তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। জানা গেছে, পাবনা বা নাটোরের ৫৫০ টাকার নিয়মিত ভাড়া এখন ১ হাজার ২০০ টাকা হাঁকা হচ্ছে। ৫০০ টাকার রংপুরের টিকিট বিক্রি হচ্ছে দেড় হাজার টাকায়। সাতক্ষীরার ৬৫০ টাকার ভাড়া গুণতে হয়েছে ৯৫০ টাকা। লোকাল বাসের অবস্থাও আরও করুণ, যেখানে ৫২ আসনের বাসে ৪০ আসনের সুবিধা দেওয়ার দোহাই দিয়ে বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বুধবার গাবতলী বাস টার্মিনাল পরিদর্শনে গিয়ে দাবি করেছেন, সব যাত্রী নির্ধারিত ভাড়ায় চলাচল করছেন এবং উল্টো কিছু পরিবহন ২০ থেকে ৩০ টাকা কম নিচ্ছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্ত্রীর এই বক্তব্যের ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, যেখানে সাধারণ মানুষ বাস্তব চিত্রের সঙ্গে এর বৈপরীত্য তুলে ধরছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রেল দুর্ঘটনা: নিরাপত্তাহীনতা ও দায়িত্বহীনতা

সড়কপথের নৈরাজ্যের বিপরীতে সাধারণ মানুষ অনেক সময় রেলপথকে কিছুটা নিরাপদ ও আরামদায়ক মনে করেন। কিন্তু বগুড়ার আদমদীঘিতে নীলসাগর এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনা সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছে। এই দুর্ঘটনায় ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়ে দেশের উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে রেল যোগাযোগ দীর্ঘ ২২ ঘণ্টা বিচ্ছিন্ন ছিল। শুধু রেলের সূচি তছনছ হয়নি, ৬৬ জন যাত্রী রক্তক্ষয়ী জখম নিয়ে ঈদ কাটানোর দুর্ভোগে পড়েছেন।

রেলওয়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই দুর্ভোগ মূলত দায়িত্বহীনতার ফল। দুর্ঘটনাস্থলে লাইন মেরামতের কাজ চলায় সেখানে গতি কমানোর লাল নিশানা ছিল, কিন্তু ট্রেনচালক সেই সতর্কতা উপেক্ষা করেছেন। ঈদে ঘরমুখী যাত্রীতে ঠাসা ট্রেনের ছাদে থাকা যাত্রীদের অনেকেই ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছেন, যা নিছক ভাগ্যের জোরে প্রাণহানি এড়ানো গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

লঞ্চে প্রাণহানি: ব্যবসায়িক লোভ ও নিরাপত্তাহীনতা

একদিকে সড়কে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও রেলে দুর্ঘটনার মাঝেই আরেকটি দুঃখজনক ঘটনা ভেসে উঠল সদরঘাটে। ঘরে ফেরার মিছিলে যোগ দিতে এসে দুই লঞ্চের মাঝখানে পিষ্ট হয়ে মারা গেলেন মো. সোহেল নামের এক তরুণ। ঢাকা থেকে ইলিশাগামী একটি লঞ্চকে অন্য একটি লঞ্চ সরাসরি ধাক্কা দেওয়ায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে চরম বিশৃঙ্খলা ও প্রতিযোগিতার গল্প দেখা গেছে। পানির ওপর দানবের মতো ভেসে বেড়ানো এসব যান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো লাভের আশায় ন্যূনতম সাধারণ বোধটুকু হারিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তাদের অতিরিক্ত লাভের আশায় মাঝ নদীতে বা পন্টুনে অনিরাপদভাবে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা এক তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। ওই ঘটনায় নিহত তরুণের সঙ্গে থাকা শ্বশুর পানিতে ডুবে গেছেন, যার এখনো খোঁজ মেলেনি, আর শাশুড়ি গুরুতর জখম নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

সমাধানের পথ: সুশাসন ও জবাবদিহি

গণপরিবহনের যেকোনো দুর্ঘটনাকে এ দেশে ভাগ্যের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। কিন্তু এসব দুর্ঘটনার অধিকাংশই অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার ফল। লঞ্চ হোক বা বাস, নিয়ন্ত্রণ যখন একচেটিয়াভাবে ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের হাতে থাকে, তখন নাগরিকের নিরাপত্তা স্বাভাবিকভাবেই বিদায় নেয়।

প্রতিটি ঈদের আগে আমরা এই অব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করি, আর প্রতিটি ঈদের পর ট্র্যাজেডিগুলো নিয়ে হা-হুতাশ করে আবার ভুলে যাই। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত পরিবহনে সুশাসন ও চালকদের জবাবদিহি নিশ্চিত না করা যাবে, ততক্ষণ ঈদের ছুটি আমাদের জন্য বয়ে আনবে একই ধরনের দুঃস্বপ্ন ও দীর্ঘশ্বাস। সাধারণ মানুষের নিরাপদ ও সাশ্রয়ী যাত্রা নিশ্চিত করতে সরকারি তদারকি ও কঠোর পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।