সুপার শপ খাতের সম্প্রসারণে টার্নওভার কর বড় বাধা
দেশের আধুনিক খুচরা বাজার বা সুপার শপ খাতের সম্প্রসারণে বিদ্যমান টার্নওভার করকে একটি বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে মোট লেনদেনের ওপর এক শতাংশ হারে টার্নওভার কর দিতে হলেও, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানে থেকেও এই কর পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে খাতটির সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগে সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাই এই করের হার কমিয়ে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
গোলটেবিল বৈঠকে দাবি উত্থাপন
সোমবার (১৬ মার্চ) রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের আধুনিক রিটেইল খাতের উন্নয়ন: প্রতিবন্ধকতা, উত্তরণের উপায় এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এই দাবি জানান। বৈঠকের আয়োজন করে বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং এতে সহযোগিতা করে এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেড। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী। এছাড়া নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা, অর্থনীতিবিদ ও আইন বিশেষজ্ঞরা এতে অংশ নেন।
খাতের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাবনা
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া। প্রবন্ধে বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের খুচরা বাজারের আকার প্রায় ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই খাতে সরাসরি সাড়ে ১৭ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আধুনিক সুপার শপগুলো কোল্ড-চেইন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খাদ্যের অপচয় কমানো এবং নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্য সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বক্তারা বলেন, “বাংলাদেশের খুচরা বাজারের বড় অংশ এখনও অসংগঠিত। সুপার শপগুলো সেই বাজারকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় নিয়ে আসছে। তাই খাতটির বিকাশে নীতিগত সহায়তা জরুরি। এ ক্ষেত্রে টার্নওভার ন্যূনতম করের হার এক শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক পঁচিশ শতাংশ নির্ধারণ করলে বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”
প্রতিবেশী দেশের উদাহরণ ও স্থানীয় চ্যালেঞ্জ
আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন বলেন, “নীতিগত সহায়তার কারণে প্রতিবেশী ভারতে সুপার শপ খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে মোট খুচরা বিক্রির প্রায় ১৫ শতাংশ সুপার শপের মাধ্যমে হয়, যেখানে বাংলাদেশে এ হার মাত্র ৩ শতাংশ। ২০০১ সালে দেশে সুপার শপ যাত্রা শুরু হলেও এখনও অনেক প্রতিষ্ঠান ভর্তুকি দিয়ে ব্যবসা চালাতে হচ্ছে।”
নীতিগত সহায়তা পেলে সুপারশপগুলো জেলা শহর ছাড়িয়ে উপজেলা পর্যায়েও বিস্তৃত হতে পারতো জানিয়ে সুপারশপ চেইন স্বপ্নের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাব্বির হাসান বলেন, “আমরা বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙতে ভূমিকা রেখেছি। শুরুতে কম দামে পণ্য বিক্রি করায় হুমকির মুখেও পড়তে হয়েছিল।” রমজান মাসে বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু পণ্যে কম দামে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি। উদাহরণ দিয়ে বলেন, “বাজারে চিনির দাম যেখানে ১০৫ টাকা কেজি, সেখানে স্বপ্নে তা ৯৭ থেকে ৯৯ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।”
অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের মতামত
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাসুদ খান, ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের সভাপতি মো. কাউসার আলম, এনবিআরের সাবেক সদস্য (কর নীতি) অপূর্ব কান্তি দাস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম আবু ইউসুফসহ সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা।
বক্তারা বলেন, “আধুনিক খুচরা বাজার খাতকে শক্তিশালী করা গেলে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে, খাদ্য অপচয় কমবে এবং ভোক্তারা নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্য সহজে পেতে পারবেন।” এজন্য করনীতি ও নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে খাতটির বিকাশে সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও জানান বক্তারা।
