লালমনিরহাটের 'বর্ষা সু' কারখানা: চামড়াজাত জুতায় স্বপ্নের যাত্রা
লালমনিরহাটের 'বর্ষা সু' কারখানা: চামড়াজাত জুতার স্বপ্ন

লালমনিরহাটের একমাত্র চামড়াজাত জুতা কারখানা 'বর্ষা সু'র উত্থান

লালমনিরহাট জেলার একমাত্র চামড়াজাত জুতা তৈরির কারখানা হিসেবে 'বর্ষা সু' প্রতিষ্ঠানটি আজ একটি উল্লেখযোগ্য নাম। শুরুটা হয়েছিল মেরামতের একটি ছোট দোকান থেকে, যা ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে একটি বড় কারখানায়। বর্তমানে এখানে অনেক কারিগর ও কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছেন, যারা সারা বছর ব্যস্ত থাকেন। তবে ঈদের সময় তাদের কর্মযজ্ঞ আরও তীব্র হয়, নির্ঘুম সময় কাটিয়ে তারা জুতা তৈরির কাজ চালিয়ে যান।

কারখানার উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ

'বর্ষা সু' কারখানা থেকে তৈরি জুতা কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুরসহ আশপাশের জেলার দোকানিরা বিক্রির জন্য নিয়ে যান। কারখানা ঘুরে দেখা যায়, কারিগররা অত্যন্ত নিবেদিতভাবে কাজ করছেন। তাদের কাজের গতি এতটাই দ্রুত যে দম ফেলার অবস্থা নেই বললেই চলে। একটি জুতা তৈরি করতে চার জন কারিগর অংশগ্রহণ করেন, যারা প্রত্যেকে জুতার আলাদা আলাদা অংশের কাজ সম্পন্ন করেন।

মালিকের বক্তব্য ও আর্থিক অবস্থা

কারখানার মালিক বিমল দাস জানান, প্রতি মাসে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার বেশি জুতা বিক্রি হয়। এই বিক্রয় থেকে কারখানার কারিগরদের মজুরিসহ সব খরচ বাদ দিয়ে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ থাকে। তিনি বলেন, '৯ বছর ধরে আমরা এই প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছি। নিজেরা জুতা তৈরি করি এবং পাইকারি বিক্রি করি। কাঁচামাল কিনতে হয় গুলিস্তান, বংশাল থেকে।' তিনি আরও যোগ করেন, '৯ বছর আগের তুলনায় এখন এক ভাগ লাভ হয়। কোনও সহায়তা নাই। আমার স্বপ্ন এখানে মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হোক। আমাদের প্রতিষ্ঠানে যদি কম সুদের ঋণের মতো প্রণোদনা দেওয়া হয়, তবে আমরা আরও ভালো কিছু করতে পারবো।'

কারিগরদের মজুরি ও কাজের ধরন

  • কারিগর বজলু মিয়া জুতার ফাইনাল বা সোলের কাজ করেন। তিনি ডজন হিসাবে কাজ করেন, এক ডজন সোলের কাজ করলে ৮৫০ টাকা মজুরি পান। দিনে তিনি এক থেকে দেড় ডজন জুতার কাজ করতে পারেন।
  • জাহিদুল ইসলাম জুতার উপরের অংশের কাজ করেন, যেমন ফিতা, জামরার কাভার, জামরা সেলাই। তিনি দুই ডজন জুতার কাজ করতে পারেন, যার জন্য ৮০০ টাকা মজুরি পান।

স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও বিশ্বাস

স্থানীয় রঞ্জু মিয়া বলেন, 'এখান থেকে নিয়মিত চামড়ার জুতা ও স্যান্ডেল কিনে ব্যবহার করি। এখানে যার দাম ৪০০ টাকা, বাজারের অন্য দোকানে তা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা বা তারও বেশি। বাজার থেকে কিনে প্রতারণার শিকার হতে হয়। প্যাকেটে এক রকম, বাস্তবে অন্যরকম। আমরা এখানে অর্ডার দিয়েও বানিয়ে নিতে পারি। এখানে প্রতারিত হওয়ার কোনও বিষয় নেই।' এই বিশ্বাস স্থানীয়দের মধ্যে 'বর্ষা সু' কারখানার প্রতি আস্থা তৈরি করেছে।

লালমনিরহাটের 'বর্ষা সু' কারখানা শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি স্বপ্নের প্রতীক। স্থানীয় অর্থনীতিতে এর অবদান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে এটি একটি মডেল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মালিকের স্বপ্ন ও কারিগরদের পরিশ্রম এই প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যা অঞ্চলের উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।