বিমান বাংলাদেশের লন্ডন-ঢাকা কার্গো ব্যবসায় ষড়যন্ত্র: শত শত কোটি টাকার ক্ষতি
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের লন্ডন-ঢাকা রুটের লাভজনক কার্গো ব্যবসা এখন পুরোপুরি বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর দখলে চলে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার, অসাধুচক্রের ষড়যন্ত্র এবং সাবেক সরকারের এক প্রভাবশালী নেতার সরাসরি হস্তক্ষেপে যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি মালিকানাধীন বৃহত্তম ও প্রাচীন কার্গো এজেন্টের চুক্তি বাতিল করা হয়। এতে করে বছরে শত শত কোটি টাকা লোকসান গুনছে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটি। বিমানের অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও জরুরি সভার কার্যবিবরণী বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
চুক্তি বাতিলের পেছনের ষড়যন্ত্র
বাংলা ট্রিবিউনের হাতে আসা বিমানের বেশকিছু অভ্যন্তরীণ নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৯ সাল থেকে জেএমজি কার্গো প্রতিষ্ঠান বিমানের সঙ্গে সফলভাবে ব্যবসা করে আসছিল। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি লন্ডন-ঢাকা রুটে বিমানের কার্গো পরিবহনে বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু ২০২০ সালে কোনও যৌক্তিক কারণ ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির কার্গো সেলস এজেন্ট (সিএসএ) চুক্তি বাতিল করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিমানের লন্ডন অফিসের তৎকালীন কান্ট্রি ম্যানেজার হারুন খানসহ একটি প্রভাবশালী পক্ষের প্ররোচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চুক্তি বাতিলের আগে জেএমজি কার্গো প্রতি ফ্লাইটে গড়ে ৮ টন কার্গো দিলেও, ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তা হঠাৎ কমিয়ে ৩ টনে নামিয়ে আনা হয়। এর পরপরই চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়, যা এই রুটে বিমানের কার্গো ব্যবসায় ধস নামায়।
আর্থিক ক্ষতির বিশাল পরিমাণ
বাংলা ট্রিবিউনের হাতে আসা ২০২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর বিমানের বিপণন বিভাগ থেকে দেওয়া এক প্রতিবেদন ও ২৭ সেপ্টেম্বরের জরুরি সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, জেএমজি কার্গোর সঙ্গে চুক্তি বাতিলের পর থেকেই বিমানের আয় তলানিতে ঠেকেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লন্ডন-ঢাকা রুটে বিমানের কার্গো আয় ছিল ৪৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে জেএমজির চুক্তি বাতিলের পর ২০২০-২১ অর্থবছরে সেই আয় নেমে আসে মাত্র ৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকায়।
বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিউল আজিম এক সভায় এই বিপুল রাজস্ব ক্ষতির জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দায়ী কর্মকর্তাদের তিরস্কার করে জেএমজি কার্গোকে দ্রুত পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। বিমানের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে এই ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বিমানের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৬০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
দায়ী কর্মকর্তাদের ভূমিকা
তদন্তে উঠে এসেছে, জেএমজির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন তৎকালীন কান্ট্রি ম্যানেজার হারুন খান এবং ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার আবু সাঈদ মো. মঞ্জুর ইমাম। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তারা লন্ডন গিয়ে কোনও তদন্ত না করেই একতরফা ও মিথ্যা প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন। বর্তমান সরকারের আমলেও এই সিন্ডিকেটের কিছু সদস্য এখন সক্রিয় থেকে পুনর্বহাল প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীর বক্তব্য
জেএমজি কার্গোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনির আহমেদ বলেন, ‘‘আমরা প্রবাসীদের সেবা দিচ্ছিলাম। আমাদের অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়ার ফলে প্রবাসীরা এখন বিদেশি এয়ারলাইন্স বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। আমরা গত পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন দফতরে আবেদন করেও বিচার পাইনি। এখন আমরা বর্তমান সরকারের কাছে সুবিচার প্রত্যাশা করছি।’’
এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য বিমানের লন্ডনের বর্তমান কান্ট্রি ম্যানেজার রিয়াদ সুলাইমানের সঙ্গে ইমেইলে যোগাযোগ করা হলেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার কাছ থেকে কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।
