ঈদ বাজারে জমজমাট কেনাকাটা: দেশজুড়ে উৎসবের আমেজ
ঈদুল ফিতরের প্রস্তুতিতে দেশের বিভিন্ন জেলার বাজারগুলোতে জমে উঠেছে কেনাকাটার ধুম। বিপণিবিতান থেকে ফুটপাত পর্যন্ত ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়ে সরগরম চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, সিলেট, যশোর ও নওগাঁর মার্কেট। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে পোশাক, জুতা, গহনা ও উপহারসামগ্রীর কেনাবেচা। নতুন পোশাকে সেজে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে নানা বয়সী মানুষ মেতে উঠেছেন কেনাকাটায়।
চট্টগ্রামে বাজারের গতি ও লক্ষ্যমাত্রা
চট্টগ্রামে রমজানের মাঝামাঝি সময় থেকে বাজারের গতি বদলাতে শুরু করেছে। জাতীয় নির্বাচন ঘিরে শুরুতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ছিল, কিন্তু এখন নগরীর শপিং মল ও মার্কেটে ক্রেতাদের ভিড় বেড়ে গেছে। বিকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কেনাকাটায় জমজমাট অবস্থা। ব্যবসায়ীদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা ঘিরে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে প্রবাসী আয় কমার আশঙ্কা থাকলেও বাজার জমেছে। এবারের ঈদে চট্টগ্রামে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন তারা।
বাজারে পাকিস্তানি পোশাকের চাহিদা বিশেষভাবে আলোচিত। ফ্যাশন ট্রেন্ডে পরিবর্তনের কারণে তরুণী ও নারীদের মধ্যে পাকিস্তানি ডিজাইনের থ্রি-পিস, লেহেঙ্গা, সারারা, ঘারারা ও ফারসি পোশাকের কদর বেশি। বালি আর্কেডের একটি দোকানের স্বত্বাধিকারী আরিফুল ইসলাম জানান, তাদের দোকানে বিক্রি হওয়া নারীদের পোশাকের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই পাকিস্তানি ডিজাইনের। এসব পোশাকের দাম ১ হাজার থেকে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত। শিশুদের পোশাকের ক্ষেত্রেও দেশীয় পণ্যের পাশাপাশি চীন ও থাইল্যান্ডের তৈরি পোশাক বিক্রি হচ্ছে।
খুলনা ও ময়মনসিংহে বাজারের চিত্র
খুলনায় ঈদ সামনে রেখে জমজমাট বাজার। বিপণিবিতান থেকে ফুটপাত সব জায়গায় ভিড়। পুরুষের তুলনায় নারীদের পোশাকের দোকানগুলোতে ভিড় বেশি, বিশেষ করে থ্রি-পিস, গাউন ও লেহেঙ্গার দোকানে। মধ্যম সারির মার্কেট ও ফুটপাতে পণ্যের দাম কম হওয়ায় সেখানে বিক্রি ভালো বলে জানান দোকানিরা। রেলওয়ে বিপণিবিতানের ব্যবসায়ী মাসুম বলেন, গত দুদিন ধরে বিক্রি বেড়েছে এবং ক্রেতাদের ভিড় লক্ষণীয়।
ময়মনসিংহে ঈদের বাজার জমে উঠেছে, ভিড় বেড়েছে পোশাক ও প্রসাধনীর দোকানগুলোতে। বেশিরভাগ ক্রেতার পছন্দের তালিকায় রয়েছে দেশীয় পণ্য, যার চাহিদা অন্যবারের চেয়ে বেশি। দাম নিয়ে দর-কষাকষি চললেও পছন্দের পোশাক কিনেই ফিরছেন অনেকে। তবে শাড়ির বাজার তুলনামূলক মন্দা থাকায় কিছুটা অখুশি ব্যবসায়ীরা। নিরাপত্তার জন্য মার্কেটগুলোতে টহল জোরদার করা হয়েছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা।
দিনাজপুরের ‘বউ বাজার’ ও অন্যান্য এলাকা
দিনাজপুরের ‘বউ বাজারে’ জমেছে কেনাকাটা। প্রতি শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সকাল থেকে শহরের মালদহপট্টি, চুড়িপট্টি ও বাসুনিয়াপট্টি এলাকায় রাস্তার দুই পাশে বসে এই বাজার, যেখানে কম দামে নারী ও পুরুষদের কাপড় বিক্রি হয়। ঈদ ঘিরে এখন উপচে পড়া ভিড়, তুলনামূলক কম দামে ভালো মানের পণ্য পাওয়ায় ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয়। কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ নুরনবী বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
সিলেটে মার্কেট ও ফুটপাতে ক্রেতাদের ভিড় থাকলেও বিকিকিনি তেমন জমে উঠেনি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ২০ রমজানের পর থেকে বিক্রি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। যশোর ও নওগাঁয়ও ঈদের মার্কেট জমজমাট, দেশীয় পোশাকের চাহিদা বেশি এবং আলোকসজ্জায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা
সকল জেলায় ঈদ বাজারকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। চুরি-ছিনতাই রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন, পাশাপাশি ব্যবসায়ী সমিতির স্বেচ্ছাসেবক দলও নজরদারি করছে। খুলনা কেএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানান, প্রতিটি মার্কেটে ফোর্স ও মোবাইল টিমের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, ঈদের দিন যতো এগিয়ে আসবে, ক্রেতাদের ভিড় ততো বৃদ্ধি পাবে। শেষ সময়ের কেনাকাটায় চাকরিজীবী ও প্রবাসীদের ফেরার পর আরেক দফা ধুম পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দামের উত্থান কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও, ঈদের উৎসবের আমেজে বাজারগুলোতে প্রাণচাঞ্চল্য বিরাজ করছে।
