ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ: যানজট, চাঁদাবাজি, উচ্চ ভ্যাট-ট্যাক্স ও আমদানি নীতির সীমাবদ্ধতা
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) শনিবার রাজধানীর ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে, যেখানে ব্যবসায়ী নেতারা যানজট, চাঁদাবাজি, উচ্চ ভ্যাট-ট্যাক্স এবং আমদানি নীতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণে উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বেসরকারি খাতে স্থিতিশীল পরিবেশের প্রয়োজনীয়তা
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ সভাপতির বক্তব্যে বলেন, বিগত কয়েক বছরে কঠোর মুদ্রানীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, অবৈধ চাঁদাবাজি, অনিয়ম-দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বেসরকারি খাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে নবনির্বাচিত সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করবে।
তিনি আরও যোগ করেন, সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ ও অনুমেয় পরিবেশ নিশ্চিতের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নীতিনির্ধারক প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে বেসরকারি খাতের সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
বাজারে তথ্য-উপাত্তের গুরুত্ব ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ
প্রধান অতিথি বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপার্সন এ এইচ এম আহসান বলেন, সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগে চলতি রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, বাজার ব্যবস্থাপনায় চাহিদা-সরবরাহ সমন্বয়ের পাশাপাশি সঠিক তথ্য-উপাত্ত নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত হলে উদ্যোক্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় কমে, যা পণ্যের মূল্য হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে সহযোগিতা করতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার এ বিষয়ে আরও সুদৃঢ় পদক্ষেপ নেবে।
বিশেষ অতিথির মতামত ও নীতিমালা সংস্কার
বিশেষ অতিথি এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খান বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য উন্নত আইনশৃঙ্খলা ও সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। গণতান্ত্রিক পরিবেশ জোরদার হলে রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও আরও উন্নত হবে বলে তিনি মত দেন। দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে দ্রুত কিছু সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেন তিনি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, আস্থার সংকট দূর করে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে উন্নত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অপরিহার্য। তিনি জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আইপিও নীতিমালা ২০২৫-২৮ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যা ব্যবসা ও বিনিয়োগ সহজ করবে।
যানজট ও চাঁদাবাজি: ব্যবসার বড় বাধা
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজধানীতে প্রায় পাঁচ লাখ ব্যাটারিচালিত নতুন অটোরিকশা যুক্ত হয়েছে, যা যানজট বাড়িয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ঈদের পর ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা হচ্ছে।
তিনি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে আমদানি নীতিমালা ও চার্জিং গ্যারেজ তদারকির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ফুটপাত ও সড়ক দখল এবং চাঁদাবাজি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
মুক্ত আলোচনায় ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
মুক্ত আলোচনায় বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা যানজট, চাঁদাবাজি, উচ্চ ভ্যাট-ট্যাক্স এবং আমদানি নীতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্য তেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী মো. গোলাম মওলা বলেন, সংকটকালে বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হলেও পরিস্থিতির উন্নতির পর দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার দৃশ্যমান হয় না।
তিনি আরও বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব এবং পরিবহনে চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের দাম বাড়ছে– এটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। নাহার কোল্ডস্টোরেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তরিকুল ইসলাম খান বলেন, উত্তরাঞ্চলে আলুর দাম কেজিপ্রতি আট টাকায় নেমে যাওয়ায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতের দাবি জানান তিনি।
সভায় ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মনসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
