ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পুনর্জন্মের যাত্রা থেমে গেলো, দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হলো প্রতিষ্ঠানটি
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আবার বন্ধ, দেউলিয়া হয়ে পুনর্জন্ম থেমে গেলো

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পুনর্জন্মের যাত্রা থেমে গেলো, দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হলো প্রতিষ্ঠানটি

এক সময় ভারতের বিশাল অংশ শাসন করা এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পথপ্রদর্শক সেই প্রভাবশালী ব্রিটিশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ আবারও বন্ধ হয়ে গেছে। দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার কারণে লন্ডনে বিলাসবহুল পণ্য বিক্রেতা হিসেবে শুরু করা কোম্পানিটির এই পুনর্জন্মের যাত্রা এবার থেমে গেলো। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য সানডে টাইমস-এর বরাতে জানা গেছে, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লিমিটেড’ লিকুইডেটর বা অবসায়ক নিয়োগ করেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির সমাপ্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ঐতিহাসিক পটভূমি এবং পুনর্জন্মের গল্প

মূল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিটি প্রায় ১৫২ বছর আগে নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছিল। তবে ২০১০ সালে একজন ব্রিটিশ-ভারতীয় ব্যবসায়ী সঞ্জীব মেহতা নামটির মালিকানা কিনে নিয়ে একে পুনরুজ্জীবিত করেন। লন্ডনের মেফেয়ারের নিউ বন্ড স্ট্রিটে ২ হাজার বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল দোকান খোলেন তিনি। সেখানে উন্নতমানের চা, চকলেট, মসলাসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করা হতো। সঞ্জীব মেহতা এই উদ্যোগকে ‘ঔপনিবেশিকতার প্রতীকের ইতিবাচক পরিবর্তন’ হিসেবে দেখেছিলেন। ২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “একজন ভারতীয় এখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিক। এর অর্থ হলো নেতিবাচকতা ইতিবাচকতায় রূপ নিয়েছে।”

আর্থিক সংকট এবং বর্তমান অবস্থা

আধুনিক এই কোম্পানিটি এখন বড় ধরনের ঋণের মুখে পড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটি তাদের মূল গ্রুপের কাছে ৬ লাখ পাউন্ডের বেশি (ভারতীয় মুদ্রায় ৬.৩ কোটি টাকা) দেনা রয়েছে। এছাড়া কর বাবদ প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার পাউন্ড এবং কর্মীদের বেতন বাবদ ১ লাখ ৬৩ হাজার পাউন্ড বকেয়া রয়েছে। বর্তমানে কোম্পানিটির ওয়েবসাইট বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে এবং লন্ডনের দোকানটি খালি পড়ে আছে। মালিক সঞ্জীব মেহতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘ইস্ট ইন্ডিয়া’ নামযুক্ত আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও বিলুপ্ত করা হয়েছে, যা তাদের ব্যবসায়িক সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং প্রভাব

১৬০০ সালে রানি এলিজাবেথ-১ এর রাজকীয় সনদের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা এই কোম্পানিটি এক সময় বিশ্বের বাণিজ্যের অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করত। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর তারা বাংলার শাসনভার নেয়। তাদের শাসনামলে ভারতের ওপর চরম শোষণ চালানো হয় এবং ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বা দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ সরকার এই কোম্পানির কাছ থেকে ভারতের শাসনভার সরাসরি নিজেদের হাতে তুলে নেয়। অবশেষে ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কোম্পানিটিকে পুরোপুরি বিলুপ্ত ঘোষণা করে, যা ঔপনিবেশিক যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি চিহ্নিত করে।

পুনর্জন্মের সমাপ্তি এবং প্রতিক্রিয়া

২০১০ সালে যখন একজন ভারতীয় উদ্যোক্তা কোম্পানিটি কিনেছিলেন, তখন একে ‘শোষিতের প্রতিশোধ’ হিসেবে বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে দেখা হয়েছিল। তবে ১৭০ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো দেউলিয়া হয়ে কোম্পানিটির অদ্ভুত এই পুনর্জন্মের সমাপ্তি ঘটলো। এই ঘটনা ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণযোগ্য, যা ঔপনিবেশিক অতীতের সঙ্গে আধুনিক ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জের সংমিশ্রণকে তুলে ধরে। সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে