ঈদ সামনে রেখে কেরানীগঞ্জ পোশাকপল্লিতে জমজমাট বেচাকেনা
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ঢাকার কেরানীগঞ্জের পোশাকপল্লির পাইকারি বাজারে বেচাকেনা জমে উঠেছে। মঙ্গলবার সকালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের পূর্ব আগানগর এলাকায় সরেজমিন দেখা গেছে, প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা এখানকার তৈরি পোশাক কিনতে ছুটে আসছেন। সব মিলিয়ে এখন বাজার বেশ সরগরম। চলতি বছর পোশাকপল্লিতে বিক্রির লক্ষ্য প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।
পোশাকপল্লির বিস্তারিত অবস্থা
কেরানীগঞ্জের আগানগর, পূর্ব আগানগর, আলম বিপণিবিতান, নুরু মার্কেট, চরকালীগঞ্জ, কালীগঞ্জ, খেজুরবাগ এলাকাসহ প্রায় দুই কিলোমিটার জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে এই পোশাকপল্লি। এখানে প্রায় ১৫ হাজার শোরুম ও পাঁচ হাজার ছোট-বড় কারখানা আছে। এসব কারখানা ও শোরুমে কাজ করছেন কয়েক লাখ শ্রমিক।
মঙ্গলবার সকালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের চরকালীগঞ্জ, কালীগঞ্জ, তানাকা মার্কেট, আশা কমপ্লেক্স, খাজা মার্কেট, আগানগর, পূর্ব আগানগর ও খেজুরবাগ এলাকার জিলা পরিষদ মার্কেট, এস আলম সুপার মার্কেট, নুর সুপার মার্কেট, চৌধুরী মার্কেট ও ইসলাম প্লাজা ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি কারখানায় পোশাক উৎপাদনে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকেরা। তাঁদের কেউ সেলাইয়ের কাজ, কেউবা সুতা বাছাইয়ের কাজ করছেন। কেউ তৈরি করা পোশাক মোড়কীকরণ করছেন। মোড়কীকরণ শেষে শ্রমিকেরা তৈরি পোশাকের বোঝা কাঁধে প্রদর্শনী কেন্দ্রে ছুটছেন।
ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া
শহিদুল আলম মার্কেটের তালহা গার্মেন্টসের মালিক মনির হোসেন বলেন, "প্রতিবছর শবে বরাতের পরদিন থেকে পাইকারেরা আসতে শুরু করেন। তবে নির্বাচনের কারণে ১ রমজান থেকে বেচাবিক্রি জমে উঠেছে।" তাঁর দোকানে ৪০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা পাইকারি দরে পাঞ্জাবি বিক্রি করা হচ্ছে। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বেচাবিক্রি চলছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকায় আশা করছেন, এবারের ঈদের বাজার ভালো যাবে।
আগানগর এলাকার সামিহা গার্মেন্টসের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, "ঈদ সামনে রেখে এবার বেচাকেনা বেশ ভালো। বিশেষ করে পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস ও শিশুদের পোশাকের চাহিদা বেশি। এবার রমজানের শুরু থেকে বাজার জমে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবেন।"
নুরু মার্কেটের মুইসিন ফ্যাশনের পরিচালক শাহীনুর রহমান বলেন, "আমরা এবার ডিজাইন ও কাপড়ের মানে একটু পরিবর্তন এনেছি। ক্রেতারা এখন নতুনত্ব খোঁজেন। এ বছর উৎপাদন খরচ বাড়ায় দামও আগের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবু পাইকারেরা ভালো সাড়া দিচ্ছেন।"
পূর্ব আগানগর সড়কের তানাকা মার্কেটের এন এ গার্মেন্টসের মালিক মুন্নি আক্তার বলেন, ঈদ উপলক্ষে প্রায় তিন হাজার প্যান্ট ও শার্ট তৈরি করেছেন। রমজান শুরুর আগেই বেশির ভাগ পোশাক বিক্রি হয়ে গেছে। জিনস প্যান্ট ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা ও শার্ট ৭০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করছেন।
মজিদ মার্কেটের শাহ মিজান গার্মেন্টসের পরিচালক মো. শাহজাহান বলেন, "রমজানের শুরুতে আমাদের মার্কেটের ব্যবসা জমে উঠেছে। আমাদের দোকানে বেশির ভাগ মেয়েদের পোশাক পাওয়া যায়। ৭০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত মেয়েদের ড্রেস বিক্রি করা হচ্ছে।"
পাইকারদের মতামত
কুমিল্লা থেকে আসা পাইকার মোহাম্মদ হাসান বলেন, কেরানীগঞ্জের পোশাকের বৈচিত্র্য বেশি। দামও তুলনামূলক কম। প্রতি ঈদেই এখানে আসেন। এবারও দোকানের জন্য বেশ বড় চালান নিচ্ছেন। তাঁদের এলাকায় এসব পোশাকের ভালো চাহিদা আছে।
বগুড়া থেকে আসা পাইকার মো. রেজাউল করিম বলেন, "বাজার এখন বেশ জমজমাট। গত বছরের তুলনায় পণ্যের দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে চাহিদা আছে। তাই ঝুঁকি নিয়েই কিনছি। ঈদের এক সপ্তাহ আগে আবার আসার পরিকল্পনা আছে।"
সমবায় সমিতির সভাপতির বক্তব্য
কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ও দোকান মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ব্যবসায়ের পরিবেশ মোটামুটি ভালো। আশা করছেন এবার পোশাকপল্লির বিক্রির লক্ষ্য সাত হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে পোশাকপল্লিতে ব্যবসা করতে পারেন, সে জন্য এবার ফুটপাতে দোকান বসতে দেওয়া হয়নি। ভোর থেকে দিবাগত রাত পর্যন্ত আনসার সদস্যদের পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
লোডশেডিংয়ের অভিযোগ তুলে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, "পোশাকপল্লিতে লোডশেডিং বেশি হয়। তাই পোশাক উৎপাদন অব্যাহত রাখতে ব্যবসায়ীরা জেনারেটরে নির্ভর করছেন। এ সুযোগে অসাধু জেনারেটর ব্যবসায়ীরা পোশাক ব্যবসায়ীদের ওপর ইচ্ছেমতো ভাড়া চাপিয়ে দিচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের স্বার্থে এ ব্যাপারে প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।"
