ঈদ পূর্বে পোশাক শিল্পের তীব্র নগদ সংকট, দুই মাসের বেতনের ঋণ চাইল বিএমইএ
ঈদে পোশাক শিল্পের নগদ সংকট, দুই মাসের বেতনের ঋণ চাইল বিএমইএ

ঈদ পূর্বে তৈরি পোশাক শিল্পে তীব্র নগদ সংকট

ঈদ-উল-ফিতরের আগমনে তৈরি পোশাক খাতে একটি গুরুতর নগদ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে দেশ। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমইএ) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে সহজ শর্তে দুই মাসের বেতনের সমতুল্য ঋণ প্রদানের জন্য আবেদন জানিয়েছে। এই ঋণটি স্বল্পমেয়াদী মজুরি সহায়তা হিসেবে শ্রমিকদের বেতন, ভাতা ও বোনাস প্রদান নিশ্চিত করতে ব্যবহার করা হবে।

বিএমইএর চিঠিতে উদ্বেগের কারণ

মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে প্রেরিত একটি চিঠিতে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এনামুল হক খান উল্লেখ করেছেন যে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈশ্বিক মন্দা এবং চলমান শুল্ক যুদ্ধের কারণে রপ্তানি আয় ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। কম কাজের অর্ডার, বিলম্বিত শিপমেন্ট এবং পিছিয়ে পড়া অর্ডারের কারণে কারখানাগুলো চাপের মধ্যে রয়েছে।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত এক বছরে প্রায় ৪০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিএমইএ জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি-মার্চ ২০২৬ সময়কালের ৬০ দিনের মধ্যে প্রায় ২৫ দিন কারখানাগুলো বন্ধ থাকবে। তবে, নিয়মিত (ফেব্রুয়ারি) বেতনের পাশাপাশি ঈদ বোনাস এবং মার্চ মাসের ৫০% অগ্রিম বেতন প্রদান করতে হবে।

বেতন প্রদানের চাপ দ্বিগুণ

ফলে, এক মাসের মধ্যে বেতন ও ভাতা প্রদানের চাপ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন ও বন্দর চার্জ বৃদ্ধি এবং ব্যাংক সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কারণে নগদ সংকট আরও গভীর হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, সংগঠনটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে সরকারি সহায়তা ছাড়া শ্রমিকদের সময়মতো মজুরি প্রদান করা কঠিন হবে।

রপ্তানি আয়ের নেতিবাচক প্রবণতা

রপ্তানি পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে বিএমইএ বলেছে যে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় মোট পোশাক রপ্তানি আয় ২.৪৩% হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে আগস্ট ২০২৫ থেকে রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে। একই সময়ে, সংগঠনটি জানিয়েছে যে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ১.৮৫% হ্রাস পেয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যচাপের কারণে রপ্তানিকারকরা প্রত্যাশিত মূল্য পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাপ্তাহিক অর্থনৈতিক সূচক অনুযায়ী, জুলাই-নভেম্বর সময়ে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার সংখ্যা ১২.৯০% হ্রাস পেয়েছে। নভেম্বর মাসে এককভাবে এই হার ৮.৪০% কমেছে। বিএমইএর ইউডি তথ্যও দেখায় যে গত অর্ধেকে অর্ডার প্রবাহে ৭.৪৭% নেতিবাচক প্রবণতা রয়েছে।

কারখানাগুলোর আর্থিক ঝুঁকি

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে যে, রপ্তানি অর্ডারের ক্ষেত্রে কারখানাগুলো সাধারণত ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে ৭০-৭৫% কাঁচামাল সংগ্রহ করে এবং প্রায় ২০% বেতন ও ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করে। কিন্তু বিলম্বিত শিপমেন্ট এবং পিছিয়ে পড়া অর্ডারের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে মূলধন আটকে আছে এবং একক ঋণগ্রহীতার সীমা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে।

বিশেষ ঋণের আবেদন

এই প্রেক্ষাপটে, বিএমইএ গভর্নরের কাছে প্রচলিত ঋণের সীমা অতিক্রম করে বিশেষ বিবেচনায় দুই মাসের বেতনের সমতুল্য ঋণ প্রদানের অনুরোধ জানিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ঋণটি তিন মাসের গ্রেস পিরিয়ড সহ ১২ মাসের মধ্যে পরিশোধ করা হবে। সংগঠনটি দাবি করেছে যে দ্রুত সহায়তা প্রদান না করা হলে শ্রমিক অস্থিরতার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে, যা দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের উপর বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

উল্লেখযোগ্য বিষয়: এই সংকট মোকাবেলায় সরকারি হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে, কারণ তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে।