বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি আগামী বাজেটের আগে রেস্তোরাঁ খাতের বিদ্যমান সংকট সমাধানে সরকারের কাছে ১১ দফা দাবি জানিয়েছে। রোববার (১০ মে) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি উপস্থাপন করা হয়।
সংকটের কারণ ও বর্তমান অবস্থা
সংবাদ সম্মেলনে সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, করোনা মহামারির অভিঘাত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি রেস্তোরাঁ খাত। এর ওপর যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা, যা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ সংকট ও উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। ফলে বাজার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের রেস্তোরাঁ খাতেও।
ইমরান হাসান আরও বলেন, ক্রমবর্ধমান খরচ, কমে যাওয়া ক্রেতা উপস্থিতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে রেস্তোরাঁ খাত গভীর সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের কাছে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রত্যাশা জানান তিনি।
১১ দফা দাবি
সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁ খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে নিম্নলিখিত ১১ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়:
- রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনায় ওয়ান স্টপ সার্ভিসের দ্রুত বাস্তবায়ন।
- আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট ও ট্যাক্সের হার সহনীয় মাত্রায় রেখে এর পরিধি বাড়ানো।
- এলপিজি সংকটের দ্রুত সমাধান এবং লাইনের গ্যাসের নতুন সংযোগ পুনরায় চালু।
- বিভিন্ন দপ্তরের অভিযানের নামে রেস্তোরাঁ মালিকদের হয়রানি বন্ধসহ অভিযান পরিচালনায় ব্যবসায়ী প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি।
- রেস্তোরাঁ সেক্টরে রাজউক, কলকারখানা, ফায়ার ও পরিবেশসহ সকল অধিদপ্তরের হয়রানি বন্ধ।
- রেস্তোরাঁ সেক্টরে কর্পোরেট আগ্রাসন বন্ধ।
- রেস্তোরাঁ সেক্টরকে শিল্প ঘোষণার বাস্তবায়ন।
- ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন ও ইস্যু পুনরায় চালু।
- রেস্তোরাঁ সেক্টরে ট্রেড ইউনিয়নের নামে মালিকদের জিম্মি, হয়রানি, চাঁদাবাজিসহ সকল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ।
- গরুর মাংস আমদানির অনুমতি প্রদান।
- সরকারি ব্যবস্থাপনায় রেস্তোরাঁ সেক্টরে অদক্ষ শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
ওয়ান স্টপ সার্ভিসের গুরুত্ব
ইমরান হাসান বলেন, দেশে জটিল লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া ও একাধিক দপ্তরের অনুমোদনের কারণে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি রেস্তোরাঁ চালু করতে প্রায় ১০-১২টি সনদ প্রয়োজন, যা পেতে ২ থেকে ৬ মাস সময় লাগে। এতে খরচ ও ভোগান্তি বাড়ে এবং খাতটির উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। তাই রেস্তোরাঁ সেক্টরের জন্য একটি সমন্বিত ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা অত্যন্ত জরুরি। এতে লাইসেন্স প্রাপ্তি সহজ হবে, সময় ও খরচ কমবে এবং কার্যকর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ভ্যাট ও ট্যাক্সের হার কমানোর দাবি
মহাসচিব জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে রেস্তোরাঁ খাতে ভ্যাট ১৫% থেকে ৫%-এ নামানো হলেও ১০% সম্পূরক শুল্ক, উৎসে করসহ অন্যান্য করের চাপে ব্যবসায়ীরা হিমশিম খাচ্ছেন। তাই আগামী বাজেটে কর সহনীয় রাখা, উৎসে কর প্রত্যাহার এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের ক্যান্টিন ও ক্যাটারিং সেবায় ভ্যাট ৫% করার দাবি জানানো হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান উচ্চ করহার করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে এবং কর ফাঁকি বাড়ায়। করের হার কমিয়ে আওতা বাড়ানো হলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর প্রদান বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।
ইমরান হাসান উল্লেখ করেন, দেশের ৮০% রেস্তোরাঁ অনিবন্ধিত, যা জনস্বাস্থ্য ও খাতের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই অনিবন্ধিত ব্যবসার বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে সবাইকে ভ্যাট-ট্যাক্সের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায়, নিবন্ধিত ব্যবসায়ীরা ভ্যাট-ট্যাক্স দেওয়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন।
গ্যাস সংকট ও এলপিজি কার্ডের আবেদন
এলপিজি সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রেস্তোরাঁ সেক্টরে এলপিজি গ্যাসের সংকট গুরুতর সমস্যায় পরিণত হয়েছে, যা ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করছে এবং খাবারের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তাই দ্রুত এলপিজি সংকট নিরসনে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আমদানি বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে লাইনের গ্যাসের নতুন সংযোগ পুনরায় চালু করা জরুরি। এছাড়া রেস্তোরাঁ মালিকদের জন্য এলপিজি কার্ড প্রদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানানো হয়।
হয়রানি বন্ধ ও ডিজিটালাইজেশন
বিভিন্ন দপ্তরের হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়ে ইমরান হাসান বলেন, রাজউক, কলকারখানা, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের জটিলতা ও অপ্রয়োজনীয় হয়রানির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। আইনের সঠিক প্রয়োগ হোক, কিন্তু হয়রানি নয়। লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ ও ডিজিটাল করতে হবে। অযৌক্তিক জরিমানা ও হয়রানি বন্ধ করে ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে রেস্তোরাঁ শিল্পকে সুরক্ষা দিতে হবে।
কর্পোরেট আগ্রাসন ও শিল্প ঘোষণা
কর্পোরেট আগ্রাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বড় কর্পোরেট গ্রুপের একচেটিয়া বিস্তার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার লড়াইয়ে ফেলেছে। সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে একচেটিয়া আধিপত্য রোধে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। এছাড়া ২০২২ সালের ২ সেপ্টেম্বর রেস্তোরাঁ খাতকে শিল্প ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়। শিল্প খাতের জন্য প্রযোজ্য ব্যাংক ঋণ, কর সুবিধা ও প্রণোদনা প্রদানের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে হবে।
শ্রমিক প্রশিক্ষণ ও রপ্তানি
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রাহকসেবা, স্বাস্থ্যবিধি ও আধুনিক রেস্তোরাঁ ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। এর মাধ্যমে আগামী ৫ বছরের মধ্যে ১০ লক্ষ প্রশিক্ষিত শ্রমিক দেশের বাইরে পাঠানো সম্ভব হবে।
উপস্থিত নেতৃবৃন্দ
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সমিতির সহসভাপতি শাহ সুলতান খোকন, ১ম যুগ্ম মহাসচিব মো. ফিরোজ আলম সুমন, সাংগঠনিক সম্পাদক তৌফিকুর ইসলাম এবং যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসান বিপু প্রমুখ।



