জাপান ঋণের সুদহার বাড়ায় বাংলাদেশের প্রকল্প পুনর্বিবেচনা
জাপান ঋণের সুদহার বাড়ায় বাংলাদেশ প্রকল্প ফেরত পাঠিয়েছে

জাপান তাদের বৈদেশিক ঋণ সহায়তার সুদের হার বাড়িয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে। বাংলাদেশের ঋণের গুরুত্বপূর্ণ উৎস জাপান এখন বাড়তি সুদে ঋণ দিচ্ছে। গত ২৯ মার্চ ঢাকায় জাপানের দূতাবাস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দেয়, যেখানে নতুন সুদের হার ও শর্তাবলি ১ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর করার কথা জানানো হয়।

নতুন সুদের হারের বিবরণ

সাধারণ জাপানি ঋণের স্থির সুদের হার গত অক্টোবরে ২ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল, যা বেড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ সুদের হার বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশীয় বিন্দু। স্থির সুদের হারের তিনটি বিকল্পের মধ্যে সর্বনিম্ন সুদের হার এখন ২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা আগে ছিল ২ শতাংশ। জাপানি নাগরিকদের জন্য পরামর্শক ফিও বেড়েছে। তবে ঋণ পরিশোধের সময়কাল ও গ্রেস পিরিয়ড অপরিবর্তিত রয়েছে। সাধারণ ও স্থির সুদহারের ঋণের ক্ষেত্রে পরিশোধের সময়সীমা ১৫ থেকে ৪০ বছর এবং গ্রেস পিরিয়ড ৫ থেকে ১০ বছর।

প্রভাবিত প্রকল্পগুলো

সুদের হার বাড়ার কারণে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) তিনটি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠিয়েছে। প্রকল্পগুলো হলো: উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্প (ইউজিডিপি), হাওর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উন্নয়ন প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ছিল। ইআরডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এত বেশি সুদে ঋণ নিয়ে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন লাভজনক হবে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জাপানের ঋণের গুরুত্ব

জাপান বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগী। ইআরডির প্রতিবেদন (২০২৪-২৫) অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ৭ হাজার ৭২৮ কোটি মার্কিন ডলার, যার ১৮ শতাংশ জাপান দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের আইডিএ (২৯ শতাংশ) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (২৩ শতাংশ) এর পরেই জাপানের অবস্থান। জাপান জাইকার মাধ্যমে মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল, যমুনা রেলওয়ে সেতুসহ বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ দিয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সম্পর্কের শীতলতা

দুটি প্রকল্প নিয়ে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কিছুটা শীতল: মেট্রোরেল-১ (কমলাপুর থেকে পূর্বাচল) ও থার্ড টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা। জাইকার শর্তে মেট্রোরেল প্রকল্পে প্রতিযোগিতার সুযোগ কম ও ব্যয় বেশি। অন্যদিকে থার্ড টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা জাপান নিজেরাই করতে চায়।

অন্যান্য ঋণদাতার সুদের হার

বিশ্বব্যাংকের আইডিএ ঋণের সুদের হার ১ দশমিক ২৫ শতাংশ, সার্ভিস চার্জ মিলিয়ে ২ শতাংশ। ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ২৫ বছরে পরিশোধ। কঠিন শর্তে সুদের হার ৪ শতাংশের বেশি। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ২ শতাংশ হারে ঋণ নেয় বাংলাদেশ, ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ২০ বছরে পরিশোধ। কঠিন শর্তে সুদের হার ৪ শতাংশের বেশি। চীনা ঋণের সুদের হার সাধারণত ২ থেকে সোয়া ২ শতাংশ, পরিশোধকাল ১৫ বছর। রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ার ঋণের সুদের হার ৪ শতাংশের মতো, পরিশোধকাল ২৮ বছর, গ্রেস পিরিয়ড ১০ বছর।

অর্থনীতিবিদদের মতামত

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, সহজ শর্তে ঋণের সুযোগ সীমিত হচ্ছে। সবাই বাজারমূল্য অনুযায়ী সুদ নিচ্ছে, ভবিষ্যতে চাপ বাড়বে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ভবিষ্যতে বিদেশি ঋণে ভেবেচিন্তে প্রকল্প নিতে হবে, যাতে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক ভূমিকা থাকে।

জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ২১ এপ্রিল জানান, বাংলাদেশ সরকারের বিদেশি ঋণ এখন ৭ হাজার ৮০০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় সাড়ে ৯ লাখ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধ করা হয় ৪০০ কোটি ডলার, যা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।