গত এপ্রিল মাসে সারা দেশে সড়কে ৪৬৩টি দুর্ঘটনায় ৪০৪ জন নিহত ও ৭০৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৫৩ জন নারী এবং ৪৮ জন শিশু। এসব দুর্ঘটনার ১৯৪টি (প্রায় ৪২ শতাংশ) ঘটেছে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। ১০৬টি ঘটনায় পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়া হয়েছে এবং ৯৭টি ঘটনায় যানবাহনের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনার ধরন ও বিভাগভিত্তিক চিত্র
এপ্রিলে ৪৬৩টি দুর্ঘটনার মধ্যে সর্বোচ্চ ১৯৩টি ঘটেছে দেশের আঞ্চলিক সড়কে, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪২ শতাংশ। জাতীয় মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৬৮টি (৩৬.২৮ শতাংশ)। বাকিগুলো ঘটেছে শহর ও গ্রামের সড়কে। এ ছাড়া গত মাসে ৭টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৪ জন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন এবং ৩৪টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ২৬ জন নিহত ও ১৭ জন আহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এপ্রিল মাসের সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে তারা।
মোটরসাইকেল ও পথচারী দুর্ঘটনা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে সড়কে ১৪২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১১৩ জন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩০.৬৬ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ১০২ জন পথচারী নিহত হয়েছেন এবং যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৪৬ জন।
এপ্রিলে দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহন ৬৫৯টি। এর মধ্যে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ, ট্রাক্টর, ট্রলি, লরি, ট্যাঙ্কলরি ও সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী ট্রাক ২৫.৯৪ শতাংশ, মোটরসাইকেল ২৩.২১ শতাংশ এবং থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-লেগুনা) ১৭ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে সকালে (২৮.৫০ শতাংশ)।
বিভাগ ও রাজধানী পরিসংখ্যান
গত এপ্রিলে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১০৯টি দুর্ঘটনায় ১০২ জন নিহত হয়েছেন। সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ১২টি দুর্ঘটনায় ১২ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় ৩৬টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত এবং ৬৭ জন আহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার কারণ ও সুপারিশ
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন দুর্ঘটনার পেছনে ১১টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো: ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো, বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা; বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা; মহাসড়কে স্বল্প গতির যানবাহন চলাচল; তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।
দুর্ঘটনা রোধে প্রতিবেদনে ১২টি সুপারিশ উল্লেখ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। প্রথম সুপারিশ হলো: জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল (এনআরএসসি) পুনর্গঠন করে এর অধীন বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএ পরিচালনা করা এবং এই কাউন্সিলের হাতে আইন, বিধি ও নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা থাকতে হবে। দ্বিতীয় সুপারিশ: বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর কাঠামোগত সংস্কার করে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে আছে: মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তাপ্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার, রাজধানীতে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু করা, বিআরটিসির বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি ও পরিবহনসেবা উন্নত করা, দক্ষ চালক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাড়ানো, সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ এবং টেকসই পরিবহন কৌশলের অধীন সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন একত্র করে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন।



