অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড (এআরটি)’ সই করার কারণে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্কের হার ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেডের আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা দিতে সম্মত হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে—রাসায়নিক দ্রব্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, মোটরযান ও যন্ত্রাংশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সরঞ্জাম, জ্বালানি পণ্য, সয়াবিন, দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, পোলট্রি, বাদাম ও ফল।
অশুল্ক বাধা দূরীকরণ
এছাড়া বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের রফতানিকারকদের জন্য দীর্ঘদিনের কিছু অশুল্ক বাধা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশ মার্কিন নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান অনুযায়ী তৈরি গাড়ি গ্রহণ করবে, মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমোদিত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম গ্রহণ করবে এবং পুনর্নির্মিত (রিম্যানুফ্যাকচারড) পণ্যের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা ও লাইসেন্সিং বাধা তুলে নেবে।
ডিজিটাল বাণিজ্য সহজীকরণ
ডিজিটাল বাণিজ্য সহজ করতে বাংলাদেশ সীমান্তপারের তথ্য প্রবাহের অনুমতি দেবে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশনের ওপর শুল্কমুক্ত নীতি বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেবে। পাশাপাশি কাস্টমস প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কৃষিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি
চুক্তি অনুযায়ী, বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। এসব কৃষিপণ্যের মোট আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৪২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে)। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ রফতানি করে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য। আর আমদানি করে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পণ্য।
কৃষিপণ্যের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে— আগামী পাঁচ বছরে প্রতি বছর কমপক্ষে ৭ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানি। পাশাপাশি এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি ডলার বা ২৬ লাখ মেট্রিক টন (যেটি কম) মূল্যের সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য। এছাড়া তুলা আমদানির পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
উড়োজাহাজ ও জ্বালানি ক্রয়
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ মার্কিন উড়োজাহাজ, জ্বালানি এবং সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে সম্মত হয়েছে। চুক্তিতে বোয়িং কেনার কথা উল্লেখ না থাকলেও প্রয়োজন অনুযায়ী উড়োজাহাজ কেনার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির তৈরি ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে আজ। পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত উড়োজাহাজ কেনার বিকল্পও রাখা হয়েছে। এছাড়া উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ ও সংশ্লিষ্ট সেবা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহের বিষয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর কথা চুক্তিতে বলা হয়েছে।
জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ (এলএনজি) বিভিন্ন জ্বালানি পণ্য দীর্ঘমেয়াদে আমদানির উদ্যোগ নেবে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিসহ ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জ্বালানি পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিরক্ষা খাতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর বিষয়ে প্রচেষ্টা চালাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একইসঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার পরিমাণ সীমিত রাখার কথাও চুক্তিতে উল্লেখ আছে।
শুল্কমুক্ত পণ্যের তালিকা
এই চুক্তির আওতায় থাকা বিভিন্ন শ্রেণির পণ্যের তালিকা প্রকাশ করেছে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতর (ইউএসটিআর)। যেখানে দেড় হাজারের বেশি পণ্য আছে— যেগুলো বাংলাদেশের বাজারে ঢুকবে শুল্কমুক্ত সুবিধায়। যুক্তরাষ্ট্র এই পণ্যগুলোর ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকে। পণ্যগুলোকে ‘এন্ট্রি ইনটু ফোর্স’ বা ইআইএফ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে গবাদি পশু, মাংস, মাছ, রাসায়নিক দ্রব্য, টেক্সটাইল, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য শিল্পজাত পণ্য।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য
বাণিজ্য চুক্তি অনুসারে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কী কী পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি আছে, তা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন। তিনি বলেন, “চুক্তিতে বাংলাদেশ ৩৫০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা) কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ছাড়া আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। বর্তমানে যে হারে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানি হচ্ছে, তা অব্যাহত রাখলে এ লক্ষ্য পূরণ হওয়া সম্ভব।”
মার্কিন রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি নিয়ে বাড়তি দামের কথা বলা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের গমের গুণগত মান ও প্রোটিনের পরিমাণ বেশি। অন্য দেশ থেকে গম আমদানিতে পচনের হার ছিল প্রায় ২০ শতাংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গমে এ হার মাত্র আড়াই শতাংশ। এর সঙ্গে প্রোটিনের পরিমাণ ১১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে।” রাষ্ট্রদূতের মতে, এই চুক্তি কোনও সহায়তা নয়, বরং বাণিজ্যিক চুক্তি, যা দুই দেশেই কর্মসংস্থান বাড়াবে ও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। এ ছাড়া চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার অঙ্গীকার করেছে, যাকে দেশের ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও ভোক্তাদের স্বাগত জানানো উচিত।



