এফডিআই আকর্ষণে পিছিয়ে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম-ইন্দোনেশিয়া অনেক এগিয়ে
এফডিআই আকর্ষণে পিছিয়ে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম-ইন্দোনেশিয়া এগিয়ে

প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এফডিআই স্টকের দিক থেকে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া বাংলাদেশের চেয়ে কয়েক গুণ এগিয়ে রয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিনিয়োগ ভবনে সোমবার (২৭ এপ্রিল) প্রকাশিত ইউএনসিটিএডি’র ‘ইনভেস্টমেন্ট পলিসি রিভিউ ইমপ্লিমেন্টেশন রিপোর্ট ফর বাংলাদেশ’-এ এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের এফডিআই স্টক দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮২৯ দশমিক ৪ কোটি ডলারে। একই সময়ে ভিয়েতনামের এফডিআই স্টক ২৪ হাজার ৯১৪ দশমিক ১ কোটি ডলার, ইন্দোনেশিয়ার ৩০ হাজার ৫৬৬ দশমিক ৬ কোটি ডলার এবং কম্বোডিয়ার ৫ হাজার ২৬৬ দশমিক ৭ কোটি ডলার। তুলনায় ভিয়েতনাম বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ১৩ গুণ, ইন্দোনেশিয়া ১৭ গুণ এবং কম্বোডিয়া প্রায় তিন গুণ এগিয়ে।

প্রবৃদ্ধি থেমে থাকার কারণ

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ২০১৩ সালের তুলনায় এফডিআই প্রবাহে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার স্থবির, বরং কিছুটা কমেছে। তিনি বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে নানা পরিকল্পনা ও নীতিগত প্রস্তাব থাকলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে নীতি গ্রহণের পাশাপাশি বাস্তবায়নে গতি আনতে হবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কমেছে এফডিআই প্রবাহ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহ ছিল ১৮০ কোটি ডলারের বেশি। তবে ২০২৪ সালে তা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। ফলে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ের তুলনায়ও বিনিয়োগ প্রবাহ কমে গেছে। যদিও এ সময়ে মোট এফডিআই স্টক প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি স্থিতিশীল ছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চাপে বিনিয়োগ পরিবেশ

এফডিআই কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২১ সালের পর থেকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার প্রায় ৩৬ শতাংশ অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। জ্বালানি আমদানিতে বিলম্ব শিল্প উৎপাদনে প্রভাব ফেলে, ফলে বিনিয়োগকারীদের ব্যয় ও অনিশ্চয়তা বেড়ে যায়। এ ছাড়া ২০২৩-২৪ সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, তৈরি পোশাক খাতে কারখানা বন্ধ হওয়া এবং শ্রমিক অসন্তোষও বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

একই সময়ে সামষ্টিক অর্থনীতিতেও চাপ বেড়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ থেকে কমে ৪ শতাংশে নেমে আসে। মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছায়। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল হয়েছে।

ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত

তবে ২০২৫ সালের প্রাথমিক তথ্য বলছে, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় ও আন্তপ্রতিষ্ঠান ঋণের মাধ্যমে এফডিআই প্রবাহ বাড়তে শুরু করেছে। মূল্যস্ফীতির চাপও কিছুটা কমছে। প্রতিবেদনে আইএমএফের বরাতে বলা হয়েছে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসতে পারে।

ইউএনডিপি বাংলাদেশের উপ-আবাসিক প্রতিনিধি সোনালী দায়ারত্নে বিনিয়োগ বাড়াতে তিনটি প্রধান করণীয় তুলে ধরেন। প্রথমত, সংস্কারের পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নে যেতে হবে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বচ্ছ ও পূর্বাভাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়ন, সমন্বয় ও পর্যবেক্ষণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, বিনিয়োগ নীতি এমন হতে হবে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করে এবং কেবল বেসরকারি পুঁজি আকর্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কার্যকর সংস্কার, নীতি বাস্তবায়নে গতি এবং সামষ্টিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগে পিছিয়ে থাকা অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে পারবে বাংলাদেশ।