দেশের সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পকে সংকট থেকে বের করে আনতে পৃথক ‘জাতীয় লেদার বোর্ড’ গঠনের দাবি জানিয়েছেন এই খাতের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। একইসঙ্গে তারা কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে সহজ ঋণ, রাসায়নিক আমদানির জটিলতা নিরসন, আন্তর্জাতিক সনদ প্রাপ্তির বাধা দূর করা এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
শনিবার রাজধানীর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে ‘চামড়া শিল্প অস্তিত্ব সংকটে: উত্তরণের পথ সন্ধান’ শীর্ষক এক সেমিনারে এই দাবি উত্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ লেদার ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন এই সেমিনারের আয়োজন করে।
সংগঠনের আহ্বায়কের বক্তব্য
সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের আহ্বায়ক সাদাত হোসেন। তিনি বলেন, দেশে চা শিল্পের জন্য টি বোর্ড এবং টেক্সটাইল খাতের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় থাকলেও চামড়া শিল্পের জন্য কোনো কার্যকর অভিভাবক প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নীতি-অবহেলায় ভুগছে এই সম্ভাবনাময় খাত।
তিনি অভিযোগ করেন, চামড়া খাতে ৪০ শতাংশের বেশি মূল্য সংযোজন হলেও এই শিল্প কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পায় না। অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে কম মূল্য সংযোজন করেও তৈরি পোশাক খাত বড় আকারের প্রণোদনা ভোগ করছে।
তাই চামড়া শিল্পকে রপ্তানিমুখী ও প্রতিযোগিতামূলক করতে দ্রুত জাতীয় লেদার বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে সমস্যা
সেমিনারে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সনদ অর্জন করতে পারছে না।
এই সমস্যা সমাধানে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ট্যানারিতে ছোট আকারের ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এছাড়া উদ্যোক্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়, যাতে তারা ২০ বছরের মধ্যে সহজ কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করতে পারেন।
কোরবানির মৌসুমে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ
বক্তারা আরও বলেন, প্রতি বছর কোরবানির মৌসুমে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয় না, যা বড় ক্ষতির কারণ হয়।
এর জন্য তারা মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ ঋণ, পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ, রাসায়নিক পণ্য আমদানিতে সুবিধা এবং কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের দাবি জানান।
অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণ
সংশ্লিষ্টরা অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণের ওপরও জোর দেন। স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য চামড়ার জুতো ও ব্যাগ ব্যবহারে প্রণোদনা নীতি গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন চামড়া শিল্প নগরী নির্মাণের আহ্বান জানানো হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের বক্তব্য
সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আব্দুল মুত্তালিব বলেন, বিশ্বব্যাপী চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজারের আকার প্রায় ৫৬০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ যদি এই বাজারের মাত্র ১ শতাংশও দখল করতে পারে, তাহলে এই খাতের রপ্তানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের এখনও বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
অভিযোগ: চামড়া পাচার
সভায় সরোয়ার তুষার বলেন, চামড়া খাত দেশের জন্য ‘স্বর্ণখনি’ হতে পারত। কিন্তু রাজনৈতিক ও নীতি-দুর্বলতার কারণে এই শিল্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তিনি খুলনা-যশোর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে চামড়া পাচারের অভিযোগ করেন।



