অর্থনীতিবিদরা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সংস্কারের কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন। তাদের মতে, ব্যাংকিং, রাজস্ব, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) আয়োজিত এক সেমিনারে এই মতামত উঠে আসে। অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা আসন্ন বাজেট, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা করেন।
সংস্কার শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, “সংস্কার শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। অতীতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর সময় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তব বাস্তবায়নে তেমন সাফল্য দেখা যায়নি।”
তিনি বলেন, সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যাংকিং, জ্বালানি ও অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো যেন কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ‘মাফিয়া ব্যবস্থার’ প্রভাবাধীন না হয়।
একইসঙ্গে তিনি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি ও পরিচালন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধিকে আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন।
খাতুন বলেন, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর না করে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিতের পরামর্শ দেন তিনি।
অযৌক্তিক শুল্ক কাঠামো
পিআরআই-এর চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান শুল্ক কাঠামো অত্যন্ত অযৌক্তিক পর্যায়ে রয়েছে। তার ভাষায়, “গড় শুল্ক হার প্রায় ৫৫ শতাংশ। এত উচ্চ শুল্ক হার বজায় রেখে কোনো দেশের সঙ্গেই কার্যকর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ গত দুই দশক ধরে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কথা বললেও এখন পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের কম দামের অন্যতম কারণ উন্মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা হলেও বাংলাদেশ এখনও সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
উৎপাদনশীলতা-ভিত্তিক নতুন প্রবৃদ্ধি মডেল প্রয়োজন
সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআই-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, শুধু সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে বা বাজারের চাহিদা বাড়িয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন উৎপাদনশীলতা-ভিত্তিক নতুন প্রবৃদ্ধি মডেল।
তার মতে, নতুন প্রবৃদ্ধি মডেলের ভিত্তি হওয়া উচিত বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, জ্বালানি সংকট সমাধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকর সংস্কার।
রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজন
রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান নাসিরুদ্দিন আহমেদ বলেন, কর নীতি প্রণয়ন ও কর আদায়ের দায়িত্ব একই প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তাই কর নীতি ও কর প্রশাসনকে পৃথক করার ওপর জোর দেন তিনি।
তিনি ভারতের উদাহরণ টেনে ক্ষুদ্র সেবা প্রদানকারী ও বাইক রাইডারদের জন্য সরল কর ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি করদাতাদের হয়রানি বন্ধের আহ্বান জানান।
বেসরকারি খাতে সংকট
বেসরকারি খাতের সংকট তুলে ধরে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, গত এক দশকে কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ব্যাংক খাত নিয়ন্ত্রণ করেছে। তারা স্বল্প সুদে ঋণ নিয়ে অর্থ পাচার করলেও সাধারণ উদ্যোক্তারা এখন উচ্চ সুদের চাপে ব্যবসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী ও সহজলভ্য অর্থায়ন ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দাবি জানান তিনি।



