একসময় ঋণ নেওয়া ছিল জীবনের বড় ধরনের আর্থিক সিদ্ধান্ত। বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসা শুরু কিংবা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ সহজে ঋণ নেওয়ার কথা ভাবতেন না। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন মোবাইল ফোনের কয়েকটি ক্লিক, ক্রেডিট কার্ডের অফার, কিস্তিতে পণ্য কেনার সুযোগ, মোবাইল অ্যাপভিত্তিক লোন কিংবা সহজ শর্তের ব্যক্তিগত ঋণ—সব মিলিয়ে ঋণ নেওয়া যেন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই সহজলভ্য ঋণের সংস্কৃতির মধ্যেই একটি বড় ভুলের কারণে ধীরে ধীরে ঋণের ফাঁদে আটকা পড়ছেন হাজার হাজার মানুষ।
বড় ভুলটি কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় ভুলটি হচ্ছে—নিজের প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব না করেই ঋণ নেওয়া এবং পুরোনো ঋণ শোধ করতে গিয়ে নতুন ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া। প্রথমে ছোট অঙ্কের কিস্তি সহজ মনে হলেও, একসময় একাধিক ঋণের চাপ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে পরিবারের স্বাভাবিক ব্যয় চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও আর্থিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের বড় একটি অংশ এখন ধার এবং ঋণনির্ভর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। অনেকেই একইসঙ্গে ব্যক্তিগত ঋণ, ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের ক্ষুদ্রঋণ, এনজিও ঋণ এবং পরিচিতজনের কাছ থেকে ধার করছেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভবিষ্যতে কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা হয় না।
ফলে মাস শেষে আয়ের বড় অংশ চলে যায় কিস্তি শোধে। এরপর বাড়িভাড়া, সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামলাতে আবারও নতুন ঋণের প্রয়োজন হয়। এভাবেই শুরু হয় ঋণের চক্র যা থেকে বেরিয়ে আসা অনেকের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
‘সহজ কিস্তি’র ফাঁদ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে ‘সহজ কিস্তি’ ধারণা থেকে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মাসে অল্প কিস্তিতে পণ্য বা ঋণ দেওয়ার প্রচারণা চালাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে মাসে কয়েক হাজার টাকা পরিশোধ করা কঠিন নয়। কিন্তু, একই সময়ে একাধিক কিস্তির দায় তৈরি হলে মোট পরিশোধের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যায়।
অনেক পরিবার এখন মাসিক আয়ের বড় অংশ শুধু ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যয় করছে। এতে সঞ্চয় কমছে, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে এবং সামান্য আয় কমে গেলেও পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক প্রতিযোগিতাও মানুষকে অপ্রয়োজনীয় ঋণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। উচ্চমূল্যের স্মার্টফোন, মোটরসাইকেল, আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক পণ্য কিংবা বিলাসী জীবনযাপনের জন্য অনেকেই কিস্তিভিত্তিক কেনাকাটায় ঝুঁকছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবনযাত্রা দেখে নিজের জীবনমান কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর প্রবণতাও বাড়ছে। অথচ, বাস্তব আয় সেই ব্যয় বহনের মতো নয়।
দ্রুত বাড়ছে ব্যক্তিগত ঋণ ও ক্রেডিট কার্ড নির্ভরতা
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছরে ব্যক্তিগত ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। গ্রাহক টানতে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান কম কাগজপত্র, দ্রুত অনুমোদন এবং ‘আগে নিন, পরে পরিশোধ করুন’—এমন অফার দিচ্ছে। কিন্তু ঋণের সুদ, বিলম্ব ফি, অতিরিক্ত চার্জ এবং চক্রবৃদ্ধি সুদের বাস্তব প্রভাব সম্পর্কে অনেক গ্রাহকের স্পষ্ট ধারণা নেই।
বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে অসচেতনতা ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে। অনেকেই ন্যূনতম টাকা পরিশোধ করে বাকি অর্থ পরে দেওয়ার সুযোগকে নিরাপদ মনে করেন। কিন্তু, এতে অবশিষ্ট অর্থের ওপর উচ্চ হারে সুদ যোগ হতে থাকে। কয়েক মাসের মধ্যেই ছোট একটি কেনাকাটার বিপরীতে বড় অঙ্কের দেনা তৈরি হয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অনেক মানুষ বুঝতেই পারেন না যে তারা ধীরে ধীরে ‘ডেট ট্র্যাপ’ বা ঋণের ফাঁদে ঢুকে পড়ছেন। কারণ প্রথমদিকে কিস্তি পরিশোধ সম্ভব হলেও পরবর্তীতে নতুন ঋণ ছাড়া পুরোনো ঋণ চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্যাংকে না গিয়েই মিলবে ৫০ হাজার টাকা ঋণ
এরই মধ্যে ডিজিটাল আর্থিক সেবাকে আরও সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ই-লোন’ বা ডিজিটাল ঋণ চালুর সুযোগ দিয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, গ্রাহকেরা ব্যাংকে না গিয়েই মোবাইল অ্যাপ, ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা ই-ওয়ালেটের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। এই ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা সার্কুলারে বলা হয়েছে, গ্রাহক নির্বাচন, ঋণ অনুমোদন, বিতরণ ও আদায়—সব কার্যক্রমই হবে সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে। গ্রাহকের সশরীরে উপস্থিতি বা সাক্ষরের প্রয়োজন হবে না; বায়োমেট্রিক তথ্যের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বাজারভিত্তিক সুদের হারে ঋণ বিতরণ করা যাবে। তবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়ন সুবিধার আওতায় দেওয়া ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে ইতিবাচক হলেও আর্থিক সচেতনতা ছাড়া সহজ ডিজিটাল ঋণ ভবিষ্যতে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ, মোবাইল ফোন থেকেই দ্রুত ঋণ নেওয়ার সুযোগ মানুষকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ঋণ নিতে উৎসাহিত করতে পারে।
গ্রামের মানুষও ঋণের চাপে বিপর্যস্ত
শুধু শহরের মধ্যবিত্ত নয়, গ্রামের কৃষক, জেলে ও নিম্নআয়ের মানুষও এখন ঋণের চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। কৃষি কাজ, মাছ ধরা, ছোট ব্যবসা কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে নেওয়া ক্ষুদ্রঋণ সময়মতো পরিশোধ করতে না পারলে শুরু হচ্ছে চাপ, তাগাদা এবং শেষ পর্যন্ত সার্টিফিকেট মামলা।
অনেক কৃষক ফসলহানির কারণে এবং জেলেরা নদী বা সাগরে মাছ কম পাওয়ায় আয় হারাচ্ছেন। ফলে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ সম্ভব হচ্ছে না। কয়েক কিস্তি বকেয়া হলেই অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। এতে ঋণের মূল টাকার চেয়ে মামলা ও হয়রানির খরচ বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণ।
গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষের আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। তারা ভয় পেয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অথবা উচ্চ সুদে নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ শোধের চেষ্টা করছেন। এতে তারা আরও গভীর ঋণচক্রে আটকা পড়ছেন।
বাড়ছে সার্টিফিকেট মামলার আতঙ্ক
আইনজীবী ও অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সার্টিফিকেট মামলা এখন গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন আতঙ্ক হয়ে উঠেছে। সামান্য ঋণ বকেয়া থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে মামলা দিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে পরিবারে অশান্তি, সম্পদ বিক্রি, গবাদিপশু হারানো, এমনকি বাড়িঘর বন্ধক দেওয়ার ঘটনাও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণগ্রহীতাদের আতঙ্কিত না হয়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা জরুরি। কোনও অবস্থাতেই ব্যাংক বা ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করা উচিত নয়। আয় কমে যাওয়া বা আর্থিক সংকটের বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল বা সময় বাড়ানোর আবেদন করা যেতে পারে।
তাদের মতে, ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে অধিকাংশ বিষয়ই দেওয়ানি প্রকৃতির। তাই মামলা হলে আদালতে অনুপস্থিত না থেকে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া জরুরি। আদালতে আর্থিক দুরবস্থার বিষয় তুলে ধরে কিস্তিতে ঋণ পরিশোধের সুযোগও চাওয়া যেতে পারে।
অনলাইন ঋণ অ্যাপের ফাঁদ
সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইনভিত্তিক অবৈধ ঋণ অ্যাপের মাধ্যমে প্রতারণা ও ব্ল্যাকমেইলের ঘটনাও বাড়ছে। এসব অ্যাপ গ্রাহকের মোবাইলের তথ্য ব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখায়, আত্মীয়স্বজনকে ফোন করে অপমান করে এবং সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় থানা কিংবা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে অভিযোগ করা উচিত। একইসঙ্গে অবৈধ অ্যাপ থেকে ঋণ নেওয়ার আগে সতর্ক থাকার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
ঋণের চাপ বাড়াচ্ছে মানসিক সংকট
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি ঋণের চাপ শুধু অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করে না, এটি মানসিক স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নিয়মিত কিস্তির চাপে অনেক মানুষ উদ্বেগ, হতাশা, অনিদ্রা ও মানসিক অস্থিরতায় ভুগছেন।
পরিবারে সম্পর্কের অবনতি, দাম্পত্য কলহ, সামাজিক অস্থিরতা এবং আত্মসম্মানবোধ হারানোর ঘটনাও বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণের চাপ মানুষকে আত্মগোপন, কর্মস্থল ত্যাগ কিংবা চরম হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণের ফাঁদ এড়াতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আর্থিক সচেতনতা। প্রয়োজন ছাড়া ঋণ না নেওয়া, মাসিক আয়ের নির্দিষ্ট সীমার বাইরে কিস্তির বোঝা না বাড়ানো এবং জরুরি সঞ্চয়ের ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
তাদের পরামর্শ অনুযায়ী, ব্যক্তিগত ঋণ নেওয়ার আগে অন্তত তিনটি বিষয় বিবেচনা করা উচিত—ঋণটি সত্যিই প্রয়োজন কি না; নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা আছে কি না এবং আয় কমে গেলে বা চাকরি হারালে পরিস্থিতি কী হবে।
একইসঙ্গে স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই আর্থিক শিক্ষা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আয় না বাড়িয়ে কৃত্রিম জীবনযাত্রা ধরে রাখার প্রবণতা এবং সহজ ঋণের সংস্কৃতি ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, এখনই আর্থিক সচেতনতা বাড়ানো না গেলে ব্যক্তিগত ঋণের বোঝা আগামী দিনে হাজার হাজার পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য ও সামাজিক সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।



