বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাংলাদেশে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জ্বালানি তেলের বাড়তি খরচ ও পরিবেশদূষণ কমাতে অনেকেই এখন বৈদ্যুতিক গাড়ি বেছে নিচ্ছেন। গত বছর আগস্টে রাইসুল ইসলাম তাঁর পুরোনো তেলচালিত গাড়ি বিক্রি করে একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনেন। তিনি জানান, আগে মাসে জ্বালানি তেলের পেছনে ৪০ হাজার টাকা খরচ হতো। এখন বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারে মাসে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল আসে মাত্র ৪ হাজার টাকা, আর তেল লাগে ২ হাজার টাকার মতো।
চার্জিং স্টেশন ও পরিকাঠামো
দেশে চার্জিং স্টেশন বাড়ছে। ক্র্যাক প্লাটুন চার্জিং সলিউশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান এ পর্যন্ত ৩২টি চার্জিং স্টেশন বসিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর শাহরিয়ার জানান, পাঁচ বছরের মধ্যে দেশে ৫ হাজার চার্জিং স্টেশন বসবে। তিনি বলেন, ‘বাড়িতে চার্জ দিলে কিলোমিটারে খরচ পড়ে ২ টাকার আশপাশে। বাণিজ্যিক স্টেশনে খরচ সাড়ে ৩ থেকে ৪ টাকা।’
বৈদ্যুতিক গাড়ির ইতিহাস
বৈদ্যুতিক গাড়ির ধারণা নতুন নয়। ১৮২৭ সালে স্লোভাক-হাঙ্গেরীয় যাজক আনিওস জেডলিক প্রথম বৈদ্যুতিক মোটর তৈরি করেন। ১৮৯৬ সালে পোপ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি আমেরিকার প্রথম ব্যবহারোপযোগী বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে আনে। ১৯০০ থেকে ১৯১০ সাল ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ির সুসময়। পরে তেলের দাম কমে যাওয়া ও ইঞ্জিনের উন্নতির কারণে জ্বালানি তেলের গাড়ি জনপ্রিয় হয়। ২০০৮ সালে টেসলা মোটরসের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক গাড়ি পুনরায় জনপ্রিয় হতে শুরু করে।
বাংলাদেশের বাজার
বাংলাদেশে ২০১৫ সালে বৈদ্যুতিক গাড়ি নিবন্ধন শুরু হয়। গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়েছে ৬৬৯টি বৈদ্যুতিক যান। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭৭টি সম্পূর্ণ তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানি হয়, যা ২০২৪-২৫ সালে বেড়ে ১৭৮টিতে দাঁড়ায়। বাজারে চীনের বিওয়াইডি শীর্ষে রয়েছে, তারা প্রতি মাসে গড়ে ৫০টি গাড়ি বিক্রি করে। দেশে প্রায় ২০টি টেসলা আমদানি হয়েছে।
উৎপাদন কারখানা
বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির কারখানা স্থাপন হচ্ছে। চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ কারখানা তৈরি করছে, যেখানে বিনিয়োগ ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। তারা এসইউভি, সেডান, ট্রাক, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল উৎপাদন করবে। রানার অটোমোবাইলস বিওয়াইডির সঙ্গে চুক্তি করে দেশে উৎপাদন ও সরবরাহ করবে।
সরকারি নীতিসহায়তা
সরকার বৈদ্যুতিক যানবাহনকে উৎসাহ দিচ্ছে। শুল্কছাড় দেওয়া হয়েছে এবং ‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল শিল্প উন্নয়ন’ নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। খসড়া নীতিমালায় আমদানি শুল্ক কমানো, নিবন্ধন ফি হ্রাস ও ব্যাংকঋণের সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি সংস্থাগুলোর কেনা গাড়ির ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ অটোমোবাইল অ্যাসেম্বেলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হাফিজুর রহমান খান বলেন, ‘দেশে উৎপাদনকে উৎসাহিত করলে বৈদ্যুতিক গাড়ির দাম নাগালের মধ্যে আসবে। আগামী পাঁচ বছরে নতুন বিক্রির অর্ধেক হবে বৈদ্যুতিক গাড়ি।’



