বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ইতিমধ্যে প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তবে দুই দেশের বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার তুলনায় বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্কের এই আকার এখনো অনেক কম বলে মনে করছেন দুই দেশের নীতিনির্ধারকেরা। এই বাণিজ্যকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে তৃতীয় দেশের মধ্যস্থতা বা মধ্যস্বত্বভোগী নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি শিপিং ব্যবস্থা চালু, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
ব্রাসিলিয়ায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক
স্থানীয় সময় শুক্রবার (১৫ মে) ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ার ঐতিহ্যবাহী পালাসিও দো প্লানালতোতে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দুই দেশের শীর্ষ উপদেষ্টারা এই আগ্রহ প্রকাশ করেন। উক্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের প্রধান উপদেষ্টা সেলসো আমোরিম নিজ নিজ দেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের অর্থনীতি পরস্পরের পরিপূরক হতে পারে। বাংলাদেশ বর্তমানে ব্রাজিল থেকে বিপুল পরিমাণ তুলা, সয়াবিন, চিনি, কৃষিপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করে থাকে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে তৈরি-পোশাক, উন্নত মানের ওষুধ, পাটজাত পণ্য ও সিরামিক ব্রাজিলের বাজারে সরাসরি রপ্তানি করার এক বিশাল ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
ব্রাজিলের শুভেচ্ছা ও গ্লোবাল সাউথে বাংলাদেশের ভূমিকা
বৈঠকের শুরুতে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও জনগণের প্রতি বিশেষ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন পৌঁছে দেন তার প্রধান উপদেষ্টা সেলসো আমোরিম। তিনি বাংলাদেশকে গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণ গোলার্ধের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান কণ্ঠস্বর হিসেবে উল্লেখ করেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও কৌশলগত অংশীদারত্ব
বৈঠকে উভয় পক্ষই চলতি বছরের ব্রাজিলের সাধারণ নির্বাচনের পরপরই অনুষ্ঠিতব্য ‘ফরেন অফিস কনসালটেশনস’ (এফওসি) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আগামী এফওসি বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে কৃষি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, বিনিয়োগ, জ্বালানি ও উদ্ভাবনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো চূড়ান্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও ব্রাজিলের বিদ্যমান সম্পর্ককে একটি শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে নেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ গভীর আগ্রহ প্রকাশ করে। বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে উপদেষ্টা কবির বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে সমতা, মর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে।
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও বৃহত্তর অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও যৌথ সমৃদ্ধিতে বিশ্বাস করে। বাংলাদেশের কূটনীতি হবে সম্পূর্ণ আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন, সক্রিয় এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক শান্তি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সমন্বিত উন্নয়নের স্বার্থে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে সম্পূর্ণ বদ্ধপরিকর।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের প্রধান উপদেষ্টা সেলসো আমোরিম বাংলাদেশের এই অবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ও ব্রাজিল উভয়ই গ্লোবাল সাউথের প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, বহুমেরুকেন্দ্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত ও কারিগরি সহযোগিতা দ্রুত সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
আমোরিম বিশেষ করে আধুনিক কৃষি, পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল রূপান্তর, জনস্বাস্থ্য, শিল্প উদ্ভাবন ও প্রতিরক্ষা গবেষণার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে যৌথ অংশীদারত্ব ও সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।



