দীর্ঘ দুই দশক পর বড় রাজনৈতিক ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটি হতে যাচ্ছে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের শর্ত— সব মিলিয়ে নতুন সরকারের প্রথম বাজেটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বাড়তি গুরুত্ব। এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন— বাজেট যেন কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না করে এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর নতুন চাপ তৈরি না হয়।
প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ বৈঠক
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে তিনি এসব নির্দেশনা দেন। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্কনীতি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আগামী বাজেটের নীতিগত কাঠামো ও কর প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করেন।
জনজীবনে প্রভাব না ফেলাই মূল বার্তা
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি কর প্রস্তাব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করেন এবং বিশেষভাবে জানতে চান— কোনও প্রস্তাবের ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তিনি কর্মকর্তাদের বলেন, রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলেও তা যেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন না করে তোলে।
বৈঠক শেষে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান সাংবাদিকদের বলেন, বাজেটের মূল ফোকাস ছিল শিল্প উদ্যোক্তাদের সুবিধা দেওয়া, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং এমন একটি করব্যবস্থা তৈরি করা যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।
সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, রাজনৈতিকভাবে নতুন সরকারের জন্য প্রথম বাজেট অত্যন্ত সংবেদনশীল। অতীতে কর বৃদ্ধির কারণে নিত্যপণ্যের দাম বাড়া, মধ্যবিত্তের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং সামাজিক অসন্তোষ তৈরি হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সে কারণেই এবারের বাজেটে জনমতের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নিত্যপণ্যে কর বাড়ানোর প্রস্তাবে আপত্তি
রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যে এনবিআর ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল, মসলা ও ফলসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের স্থানীয় সরবরাহে উৎসে কর দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দেয়। বর্তমানে স্থানীয় ঋণপত্র কমিশনের ওপর উৎসে কর শূন্য দশমকি ৫০ শতাংশ; যা বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়।
তবে প্রধানমন্ত্রীর আশঙ্কা, এ ধরনের সিদ্ধান্ত মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। ফলে তিনি বিষয়টি আরও পর্যালোচনার নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনীহার কারণে নিত্যপণ্যে কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত থাকতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে আছে খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে। এমন পরিস্থিতিতে নিত্যপণ্যে অতিরিক্ত কর আরোপ করলে বাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার ঝুঁকি ছিল।
করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে
স্বস্তির খবর হিসেবে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। বর্তমানে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। নতুন বাজেটে এটি বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এর ফলে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী ও ক্ষুদ্র আয়ের করদাতারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব ছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত করমুক্ত রাখা, নতুন সরকার সেটি আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মোটরসাইকেল ও অটোরিকশায় করের পরিকল্পনা
একদিকে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ না দেওয়ার কথা বলা হলেও, অন্যদিকে রাজস্ব বাড়াতে নতুন কিছু খাতকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনাও করছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।
প্রাথমিকভাবে এনবিআর ১১১-১২৫ সিসি মোটরসাইকেলের জন্য ২ হাজার টাকা, ১২৬-১৬৫ সিসির জন্য ৫ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলের জন্য বছরে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম আয়কর প্রস্তাব করেছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী এ হার কমানোর নির্দেশ দেন। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ১১১-১২৫ সিসিতে ১ হাজার টাকা, ১২৬-১৬৫ সিসিতে ৩ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলে ৫ হাজার টাকা কর আরোপের কথা ভাবা হচ্ছে।
একইভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকেও করের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় বছরে ৫ হাজার টাকা, পৌরসভায় ২ হাজার এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ১ হাজার টাকা কর ধার্যের আলোচনা হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী এখানেও হার কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং একইসঙ্গে জনঅসন্তোষ এড়িয়ে চলা। কারণ মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা এখন নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের অন্যতম প্রধান বাহন ও জীবিকার উৎস।
ধনীদের জন্য আসছে ‘সম্পদ কর’
বাজেটে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত পরিবর্তন হতে যাচ্ছে সম্পদ কর বা ‘ওয়েলথ ট্যাক্স’ চালুর মাধ্যমে। বর্তমানে চার কোটি টাকার বেশি সম্পদের ক্ষেত্রে সারচার্জ আরোপ করা হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, সরাসরি সম্পদের নিট মূল্যের ওপর কর ধার্য করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ৪ থেকে ১০ কোটি টাকার সম্পদে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ; ১০ থেকে ২০ কোটি টাকায় ১ শতাংশ; ২০ থেকে ৫০ কোটি টাকায় ১ দশমিক ৫০ শতাংশ; ৫০ কোটির বেশি সম্পদে ২ শতাংশ কর আরোপের চিন্তা করা হচ্ছে।
সরকারের ধারণা, এর মাধ্যমে উচ্চবিত্ত শ্রেণিকে করের আওতায় এনে রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব হবে, একইসঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ কম রাখা যাবে।
ব্যবসা-বিনিয়োগবান্ধব কর কাঠামোর ইঙ্গিত
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, এমন করনীতি তৈরি করতে হবে যাতে বিনিয়োগ বাড়ে, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হয় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। তিনি বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষ শ্রমভিত্তিক শিল্পকে উৎসাহ দেওয়ার কথা বলেছেন।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রী চান না কোনও কর ছাড় কেবল নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর সুবিধায় ব্যবহৃত হোক। বরং পুরো খাত যাতে উপকৃত হয়, সেভাবে নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রফতানি বাড়াতে খাতভিত্তিক বন্ড সুবিধা সম্প্রসারণ, দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ এবং বিনিয়োগ বাড়াতে আলাদা কমিটি গঠনের নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি।
আইএমএফের চাপ বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশকে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে চাপ দিয়ে আসছে। সংস্থাটি কর ছাড় কমানো, করের আওতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে ভ্যাট বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। কিন্তু নতুন সরকার রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সেই পথ পুরোপুরি অনুসরণ করতে চাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় ফেরার পর প্রথম বাজেটে জনগণের ওপর বাড়তি চাপ দিলে সরকারের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ফলে সরকার এখন ‘রাজস্ব বৃদ্ধি’ ও ‘জনস্বস্তি’ এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ মনে করেন, কর বাড়ানোর আগে কর ফাঁকি রোধ, এনবিআরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করাই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট
সব মিলিয়ে এবারের বাজেট প্রস্তুতিতে সরকারের রাজনৈতিক বার্তাটি স্পষ্ট– ‘গরিবের ওপর বোঝা নয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে জোর’। তবে বাস্তবে রাজস্ব ঘাটতি, উন্নয়ন ব্যয়, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শর্তের মধ্যে থেকে সরকার কতটা জনবান্ধব বাজেট দিতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।



