ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সৃষ্ট খেলাপি ঋণের অর্থ বিদেশ থেকে ফেরাতে আন্তর্জাতিক সংস্থাকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে ৯টি আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) স্বাক্ষর করে ‘নো উইন, নো ফি’ ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রথম ধাপে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলম এবং শিল্প গ্রুপ বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা ও ওরিয়ন সংশ্লিষ্ট ছয়টি মামলায় এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার সংসদে টেবিলে উপস্থাপিত প্রশ্নোত্তরে কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলামের এক প্রশ্নের জবাবে সরকারের এই উদ্যোগের কথা জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযুক্ত ঋণখেলাপিদের বিদেশে থাকা অর্থ ও সম্পদ শনাক্ত করে তা দেশে ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকগুলোকে আইনি সহায়তা দেবে। পরবর্তী সময়ে এ কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
গোপনে জটিল পদ্ধতিতে অর্থপাচার, পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ নিরূপণ কঠিন
নেত্রকোনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানান, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে বিভিন্ন জটিল পদ্ধতি অবলম্বন করে বিদেশে পাচার করা হয়। এ বিষয়ে দেশে বা বিদেশে সঠিক, পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য তথ্য বা প্রতিবেদনের অভাবে বাংলাদেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে সেটির প্রকৃত ও সঠিক পরিমাণ নিরূপণ করা অত্যন্ত কঠিন। প্রশ্নকর্তা মাছুম মোস্তফা তার লিখিত প্রশ্নে জানতে চান, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে অবৈধভাবে পাচারকৃত টাকার মোট পরিমাণ কত? কী পরিমাণ টাকা ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং তা কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে? জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে—২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১ দশমিক ৮ লাখ কোটি টাকা)। এই অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ বাংলাদেশের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ, রফতানি ও রেমিট্যান্স আয়ের এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশ, বাংলাদেশের জাতীয় সঞ্চয়ের প্রায় ১১ দশমিক ২ শতাংশ, নিট বৈদেশিক সহায়তা এবং এফডিআই প্রবাহের প্রায় দ্বিগুণ।
মুদি দোকান, মিষ্টান্ন ভান্ডার ও বিউটি পার্লারসহ ১৬ ব্যবসায় ভ্যাট বসবে
সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপি দলীয় সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদকে জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পাশ হলে আগামী মাস থেকে মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) আওতায় আসবে মুদি দোকান, মিষ্টান্ন ভান্ডার ও বিউটি পার্লারসহ ১৬ ধরনের ব্যবসা। সেলিনা সুলতানার প্রশ্ন ছিল—বিগত অর্থবছরে ভ্যাট থেকে সরকারের রাজস্ব আয় কত ছিল? নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান বা উত্সকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে কি না? থাকলে সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠান বা উেসর তালিকা কী? জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভ্যাট বাবদ সরকারের আয় ছিল এক লাখ ৪১ হাজার হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। তিনি জানান, আগামী অর্থবছরে ১৬ ধরনের ব্যবসা খাতকে ভ্যাটের সুর্নিদিষ্ট করের আওতায় আনার পরিকল্পনা সরকারের আছে। এগুলো হলো—মুদি দোকান, তৈরি পোশাক বা কাপড়ের দোকান, কনফেকশনারি, কসমেটিকসের দোকান, প্লাস্টিকের সিরামিকের গৃহস্থালি পণ্য ও জুতার দোকান, হার্ডওয়্যার পণ্যের বিক্রেতা, ডেকোরেটরস; মোবাইল ফোন, এসি, ফ্রিজ, ওভেন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিক্রেতা; পেইন্ট ও হার্ডওয়্যার এবং স্যানিটারি ও ফিটিংস, টাইলসের দোকান, ঢেউটিনের দোকান, রড ও সিমেন্ট, ফার্ণিচারের দোকান, বিউটি পার্লার, মিষ্টান্ন ভান্ডার এবং রেস্টুরেন্ট।
বৈদেশিক ঋণ ৭৮ হাজার ২৩৩ দশমিক ৪৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
জামালপুর-৩ আসনের এমপি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, এ বছরের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৭৮ হাজার ২৩৩ দশমিক ৪৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে কনসেশনাল ঋণ (নমনীয় শর্তের ঋণ) ৬১ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং নন-কনসেশনাল ঋণ (কঠিন শর্তের ঋণ) ৩৮ দশমিক ০৩ শতাংশ। মন্ত্রী জানান, বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে—২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ হতে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের ফলে আমাদের বৈদেশিক ঋণের কনসেশনালিটি ধীরে ধীরে কমে আসছে। পাশাপাশি একই সময় থেকে সরকারের বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ও বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সামনের বছরগুলোতে ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের দায় বৃদ্ধি পাবে। অর্থমন্ত্রী জানান, এসব চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখে সরকার বেশকিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে ঋণ প্রস্তাব ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্প প্রস্তাব নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে যাতে উচ্চ সুদের বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে কোনো অপ্রয়োজনীয় বা কমগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়িত না হয়। যেসব প্রকল্পের উচ্চ ইকোনমিক রিটার্ন রয়েছে শুধু সেসব প্রকল্পের জন্যই বৈদেশিক ঋণ বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর সময় বৃদ্ধি ও ব্যয় বৃদ্ধির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রকল্পের নিবিড় তদারকি শুরু করেছে সরকার। সরকারের মধ্যমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনা নীতি (মিডিয়াম টার্ম ডেট ম্যানেজমেন্ট স্ট্র্যাটেজি) হালনাগাদ করার কাজ চলছে। ঋণ ব্যবস্থাপনাকে টেকসই ও সহনশীল করার লক্ষ্যে ডেট সাসটেইনেবিলিটি অ্যানালাইসিস (ডিএসএ) করা হচ্ছে। সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনার সার্বিক গুণমান উন্নয়নের জন্য শিগিগরই প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সংস্কারের জন্য একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে।
তারল্যসংকটে ব্যাংকগুলোকে ৭৫ হাজার কোটি টাকার সহায়তা
সংরক্ষিত আসনের সদস্য মোসাম্মত্ শাম্মী আক্তারের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, অর্থসংকটে গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে না পারা ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত জরুরি তারল্যসহায়তা দিচ্ছে। গত ১৫ জুন পর্যন্ত জরুরি তারল্যসহায়তা হিসেবে ৭৫ হাজার ৯০৩ কোটি ১১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। শতভাগ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আসছেন এ বছরের মধ্যে চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদের প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, দেশে বর্তমানে মোট ব্যাংক হিসাবের (অ্যাকাউন্ট) সংখ্যা ১৯ কোটি ৩২ লাখ ৫১ হাজার ২৩২। এর মধ্যে সঞ্চয়ী হিসাব ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫টি এবং ঋণ হিসাবের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬৭টি। অর্থমন্ত্রী আরো জানান, ২০২৬ সালের মধ্যে শতভাগ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার জাতীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কৌশল (এনএফআইএস) প্রণয়ন করেছে। বর্তমানে দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার ৬৪ দশমিক ৫০ শতাংশ।
১৪ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ
গাইবান্ধা-৪ আসনের এমপি মোহাম্মদ শামীম কায়সারের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ কর্মসূচির আওতায় চলতি অর্থবছরে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে ১৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৩১ জন কৃষক উপকৃত হয়েছেন। রাজস্বদাতার সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৩৮ লাখ ময়মনসিংহ-৮ আসনের লুত্ফুল্লাহেল মাজেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমানে নিবন্ধিত রাজস্ব প্রদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ কোটি ৩৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৬। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ সংখ্যা ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেড়েছে। দেশে ৬৩টি ব্যাংকের ১১ হাজারের বেশি শাখা সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের আমিরুল ইসলাম খানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশের ৬৩টি ব্যাংক ১১ হাজার ৩২৬টি শাখা এবং ৪ হাজার ৯২৯টি উপশাখার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার ৭৫ দশমিক ৩০ শতাংশ অর্জন সংরক্ষিত আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৯০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৭৫ দশমিক ৩০ শতাংশ।
একীভূত পাঁচ ব্যাংক নিয়ে যা বললেন অর্থমন্ত্রী
সরকারি ও বিরোধী দলের একাধিক সংসদ সদস্যের পৃথক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ (এক্সিম ব্যাংক), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে ব্যাংক রেজোল্যুশন স্কিম-২০২৫-এর আওতায় আনা হয়েছে। এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে এবং আমানত সুরক্ষা আইন-২০২৬ অনুযায়ী প্রত্যেক গ্রাহককে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করা হচ্ছে। তিনি জানান, বর্তমানে আরো যেসব ব্যাংক তারল্যসংকটে রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগ কাজ করছে। প্রয়োজন হলে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন-২০২৬ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, আমানত সুরক্ষা আইন-২০২৬ অনুযায়ী সুরক্ষিত আমানতের সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবে আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে ইতিমধ্যে ১২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
কর আপিলেট ট্রাইব্যুনালের আটটি বেঞ্চে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ১৬২৪ মামলা
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু সংসদকে জানান, বর্তমানে দেশের কর আপিলেট ট্রাইব্যুনালের আটটি বেঞ্চে সর্বমোট ১ হাজার ৬২৪টি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। আয়কর আইন অনুযায়ী অনিষ্পন্ন মামলাগুলো ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা হচ্ছে। অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫৫ হাজার এমএফএস অ্যাকাউন্ট স্থগিত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল হুন্ডির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৫৫ হাজার মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টের লেনদেন স্থগিত বা ফ্রিজ করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।



