একসময় আধুনিক ব্যাংকিং সেবা ও সুদের হার বেশি হওয়ার কারণে বেসরকারি ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আগ্রহ ছিল বেশি। এখন সেই আমানতকারীদের একটি বড় অংশ আবার সরকারি ব্যাংকে ফিরতে শুরু করেছেন। এর ফলে আমানত প্রবৃদ্ধিতে বেসরকারি ব্যাংককে ছাড়িয়ে গেছে সরকারি ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এক বছরে বেসরকারি খাতের ব্যাংকের চেয়ে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে আমানতে প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে। তবে টাকার অঙ্কে আমানতের বেশির ভাগই এখনো বেসরকারি ব্যাংকের দখলে রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের বেসরকারি খাতে এক ডজনের বেশি ব্যাংকের দুরবস্থা এবং অনেক ব্যাংক থেকে আমানত ফেরত না পাওয়ায় বেসরকারি ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আস্থায় চিড় ধরেছে। আমানতের টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তার কথা বিবেচনা করে অনেকে এখন সরকারি ব্যাংকে ঝুঁকছেন। এর প্রভাবই পড়েছে এই খাতের ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধিতে।
গত বছরের জানুয়ারি-মার্চের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় সোয়া ১৩ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের আমানতে প্রবৃদ্ধি হয় সাড়ে ১২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত ব্যাংকভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫ কোটি টাকায়। গত বছরের একই প্রান্তিকে ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ২৩ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। পুরো ব্যাংক খাতে এক বছরে আমানত প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১২ দশমিক ১৯ শতাংশ। ব্যাংক খাতে গড়ে আমানতের সুদহার ৬-৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। প্রকৃত আমানত বৃদ্ধির হার অবশ্য আরও কম।
এ কথাও সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ে সরকারি কিছু ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আস্থা বেড়েছে। ফলে সরকারি ব্যাংকের আমানতে বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।—মাসরুর আরেফিন, চেয়ারম্যান, এবিবি ও এমডি, সিটি ব্যাংক
আমানতসংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মার্চের তুলনায় চলতি বছরের মার্চের শেষে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের (শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকসহ) আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার ১২ দশমিক ৫১ শতাংশ। গত মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানতের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৯১ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। একই সময়ে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকে আমানত ৬০ হাজার ১৮৩ কোটি টাকা বেড়ে ৫ লাখ ১৬ হাজার ১১৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। তাদের আমানতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ২০ তাংশ।
রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। উদাহরণ হিসেবে সোনালী ব্যাংকের কথাই ধরা যাক। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ২০ কোটি টাকা। গত বছর শেষে তা ১৪ হাজার ৬০১ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬২১ কোটি টাকায়। এক বছরে ব্যাংকটির আমানতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ শতাংশ।
আমানতে প্রবৃদ্ধির দিক থেকে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়েও এগিয়ে আছে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক—এই তিন বিশেষায়িত ব্যাংকে গত বছরের মার্চের তুলনায় এ বছরের মার্চে আমানত বেড়েছে ৭ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার ১৩ দশমিক ২৯ শতাংশ। গত মার্চ শেষে বিশেষায়িত ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এক বছর ধরে বেসরকারি বেশ কিছু ব্যাংক থেকে আমানত ফেরত পাচ্ছেন না আমানতকারীরা। আবার বেসরকারি খাতের শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে একটি ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ফলে ওই পাঁচ ব্যাংকের প্রতিও আমানতকারীদের আগ্রহ বা আস্থার সংকট রয়েছে। এ অবস্থায় তাঁরা সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। যার প্রভাব এসব ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধিতে পড়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতের যেসব ব্যাংক ভালো অবস্থায় রয়েছে সেগুলোতেও আমানত উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে বলে জানান খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে বেসরকারি খাতের ব্যাংকের বড় একটি অংশের প্রতি আমানতকারীদের আস্থার সংকটের কারণে সার্বিকভাবে এই খাতে আমানত প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
জানতে চাইলে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন বলেন, বেসরকারি খাতের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে আমানতের প্রবৃদ্ধি শূন্যের কোটায় নেমে গেছে। এ ছাড়া প্রচলিত ধারার কিছু বেসরকারি ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। এর বিপরীতে ভালো মানের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকের আমানত অনেক বেড়েছে। তারপরও বেশিসংখ্যক বেসরকারি ব্যাংকের আমানত কমে যাওয়ায় সার্বিকভাবে এই খাতের আমানতে প্রবৃদ্ধি কমেছে। পাশাপাশি এ কথাও সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ে সরকারি কিছু ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আস্থা বেড়েছে। ফলে সরকারি ব্যাংকের আমানতে বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানতের মধ্যে ৬৯ শতাংশই রয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর দখলে। আর ব্যাংক খাতের মোট আমানতের প্রায় ২৪ শতাংশ এখন রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের হাতে। সরকারি মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর হাতে রয়েছে মোট আমানতের প্রায় ৩ শতাংশ। এ ছাড়া মোট আমানতের ৪ দশমিক ১২ শতাংশ আছে বিদেশি মালিকানাধীন ব্যাংকের হাতে।
ব্যাংক খাতে গত এক বছরে আমানত যতটা বেড়েছে তার মধ্যে শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে আমানতের প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে। গত বছরের মার্চের তুলনায় চলতি বছরের মার্চ শেষে গ্রামাঞ্চলে ব্যাংক আমানত বেড়েছে ৪২ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা, এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। আর শহরাঞ্চলে উল্লিখিত সময়ে আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ৪১ কোটি টাকা, এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
গত মার্চের শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানতের মধ্যে শহরাঞ্চলের আমানতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ লাখ ১৪ হাজার ১৯৮ কোটি টাকায়, যা মোট আমানতের ৮৪ শতাংশ। আর গ্রামাঞ্চলের আমানতের পরিমাণ ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট আমানতের প্রায় ১৬ শতাংশ।



