বাংলাদেশ ব্যাংকে মব ও বিশৃঙ্খলা: রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় অব্যাহত সংকট
বাংলাদেশ ব্যাংকে মব ও বিশৃঙ্খলা: রাজনৈতিক প্রভাব

বাংলাদেশ ব্যাংকে মব ও বিশৃঙ্খলা: রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় অব্যাহত সংকট

বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরে মব তৈরি, বিক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে দাবি আদায়ের ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও এমন বহু ঘটনা ঘটলেও, মাত্র একটি ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাই এই অবস্থার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ফলে এসব ঘটনা অব্যাহত রয়েছে এবং এর মাত্রা দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে।

সাম্প্রতিক ঘটনা: গভর্নরের উপদেষ্টাকে বের করে দেওয়া

সর্বশেষ গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে মব তৈরি করে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম নেতৃত্ব দেন, যিনি উপদেষ্টার ঘাড় ধরে গাড়িতে তোলার কাজে অংশ নেন। এর আগে, গভর্নর পরিবর্তনের সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে আহসান এইচ মনসুর বাংলাদেশ ব্যাংক ছেড়ে চলে যান।

বাংলাদেশ ব্যাংককে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা ‘কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো এখানেও অভ্যন্তরে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে গত নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণ মানুষের জন্য পাঁচ ধরনের সেবা বন্ধ করে দিয়েছে, যার মধ্যে সঞ্চয়পত্র বিক্রি ও ছেঁড়া নোট বিনিময় অন্তর্ভুক্ত। তবে, এই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও বছরের পর বছর ধরে ব্যাংকের কিছু কর্মচারী ও কর্মকর্তা বিক্ষোভ ও মব তৈরির মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে চলেছেন।

সমিতি ও ক্লাবের মাধ্যমে সংগঠিত আন্দোলন

বাংলাদেশ ব্যাংকে নানা ধরনের দাবি উত্থাপনের জন্য একাধিক সমিতি ও ক্লাব সক্রিয় রয়েছে। ব্যাংকের বিভিন্ন ইস্যুতে এসব সংগঠনের ব্যানারে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্দোলন পরিচালনা করেন। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতেও এই সমিতিগুলোর একটি অংশ নেতৃত্ব দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মোট ৯টি ক্লাব ও সমিতি রয়েছে। সহকারী পরিচালক ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল, ক্যাশ অফিসারদের জন্য অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং সব ধরনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ক্লাব কার্যকর। এছাড়াও, হলুদ, সবুজ ও নীল দল নামে রাজনৈতিক দল-সমর্থিত গ্রুপগুলো সক্রিয়, যেগুলো আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থক কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত।

গভর্নর হেনস্তার ঐতিহাসিক ধারা

বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে হেনস্তা করার প্রথম উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ১৯৯৬ সালে। তখন আওয়ামী লীগ সদ্য ক্ষমতায় এসেছে এবং গভর্নর খোরশেদ আলমকে বরখাস্ত করা হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁকে ঘেরাও করে রেখেছিলেন এবং নতুন গভর্নর লুৎফর রহমান সরকারের হস্তক্ষেপের পরই তিনি নিরাপদে অফিস ত্যাগ করতে পেরেছিলেন।

২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদও বিদায়কালে উচ্ছৃঙ্খল আচরণের শিকার হন। কর্মকর্তারা তাঁকে আটক করে দাবি আদায়ের চেষ্টা চালান, যা শেষ পর্যন্ত তাঁকে অন্য পথে অফিস ত্যাগ করতে বাধ্য করে।

একমাত্র শাস্তির ঘটনা ও রাজনৈতিক প্রভাব

বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য মাত্র একবার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০০৩ সালে গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদকে এক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করার পর ১০ জন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়, যারা বিএনপি-সমর্থিত ছিলেন। এই ঘটনায় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়ায় শাস্তি সম্ভব হয়েছিল।

অন্যদিকে, ১৯৯৭ সালে বেক্সিমকো গ্রুপের সালমান এফ রহমান গভর্নর লুৎফর রহমান সরকারের কলার চেপে ধরলেও কোনো শাস্তি পাননি, কারণ তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কর্মচারীরা একজন মহাব্যবস্থাপককে মারধর ও গভর্নরকে গালিগালাজ করলেও শেষ পর্যন্ত তারা চাকরিতে ফিরে আসেন।

সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

২০২৪ সালের ৭ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরদের পদত্যাগ দাবি করে মিছিল করেন এবং একজন ডেপুটি গভর্নরকে সাদা কাগজে সই করতে বাধ্য করেন। এই ঘটনার পর আহসান এইচ মনসুর নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এমন বিক্ষোভ দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে এবং এটি একটি বিরল ঘটনা। তিনি নতুন সরকার ও গভর্নরকে যথাযথ শাস্তি দেওয়ার আহ্বান জানান, নতুবা এমন ঘটনা বারবার ঘটবে বলে সতর্ক করেন।