বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালায় ক্রেডিট কার্ডের ঋণের সীমা দ্বিগুণ করা হয়েছে। এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে গ্রাহকরা আরও বেশি তারল্য ও ক্রয়ক্ষমতা পাবেন বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই নীতিমালার ইতিবাচক প্রভাব, গ্রাহক সুরক্ষা, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
নতুন নীতিমালার প্রভাব
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতিমালাটি বর্তমানে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হলে গ্রাহকেরা আরও বেশি তারল্যের সুবিধা ও উচ্চতর ক্রয়ক্ষমতা উপভোগ করতে পারবেন। বিশেষ করে উচ্চ আয়ের পেশাজীবী গ্রাহকদের জরুরি আর্থিক প্রয়োজনে কিংবা বড় কোনো কেনাকাটায় এটি অতিরিক্ত আর্থিক নমনীয়তা দেবে। আমাদের শক্তিশালী ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে গ্রাহকেরা এই বর্ধিত ঋণের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবেন, যা দীর্ঘ মেয়াদে তাঁদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
স্বচ্ছতা ও গ্রাহক আস্থা
কার্ডের চার্জ বা সুদের হার নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে অস্বচ্ছতার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এমটিবি সব সময় স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী। আমাদের কার্ডসংক্রান্ত চার্জ সব সময় অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত থাকে। এর বাইরে এমটিবি কোনো ধরনের গোপন ফি গ্রাহকদের ওপর আরোপ করে না। চার্জ নীতিমালায় কোনো পরিবর্তন এলে গ্রাহকদের দ্রুত জানানো হয়। বিলিংয়ের প্রক্রিয়া সহজ করতে আমরা ‘সিঙ্গেল অ্যাকাউন্ট পদ্ধতি’ চালু করেছি, যেখানে দেশি ও বিদেশি সব লেনদেন একই পদ্ধতিতে বাংলাদেশি টাকায় দেখতে পারেন। এ ছাড়া প্রতি মাসের স্টেটমেন্টের সঙ্গেই চার্জের তালিকা সংযুক্ত থাকে, যাতে গ্রাহকদের মধ্যে কোনো অস্পষ্টতা না থাকে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা
ডিজিটাল জালিয়াতি বা সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় এমটিবির কার্ডে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, নিরাপত্তার প্রশ্নে আমরা কোনো আপস করি না। গ্রাহকদের সুরক্ষায় আমরা ইএমভি অ্যান্টি–ফ্রড চিপ ও টু–ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন ব্যবহার করছি, যা কার্ড ক্লোনিং রোধ করে। আমাদের সিস্টেমে রিয়েল–টাইম ট্রানজেকশন অ্যালার্ট ও ফ্রড মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা যুক্ত রয়েছে, যা যেকোনো সন্দেহজনক কার্যক্রম তাৎক্ষণিক শনাক্ত করতে পারে। ই–কমার্সের সুরক্ষায় আমরা ওটিপি প্রটোকল নিশ্চিত করি। আধুনিক এনক্রিপশন প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা আন্তর্জাতিক মানের সুরক্ষা স্তর বজায় রাখছি।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধা
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের লেনদেন সহজ করতে এমটিবি বিশেষায়িত বিজনেস ক্রেডিট কার্ড দিচ্ছে। এর মাধ্যমে জামানতবিহীন ঋণের সুবিধা ও সর্বোচ্চ ৪৫ দিন পর্যন্ত সুদমুক্ত সময়সীমা প্রদান করা হয়। এর ফলে ব্যবসায়ীরা সহজেই কাঁচামাল ক্রয় বা নিত্যদিনের খরচ মেটাতে পারেন। পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যেকোনো সময় লেনদেন ট্র্যাকিং ও সাপ্লায়ারদের পেমেন্ট করার সুযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের জন্য আকর্ষণীয় ক্যাশব্যাক অফার, স্বল্প এমডিআর রেট ও দ্রুত সেটেলমেন্টের সুবিধা দেওয়া হয়।
ইএমআই সুবিধা ও গ্রাহক সাড়া
ক্রেডিট কার্ডের ইএমআই–সুবিধা গ্রাহকদের ব্যক্তিগত ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি দিচ্ছে। সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ইএমআইয়ের সুবিধা বড় অঙ্কের কেনাকাটাকে, যেমন ইলেকট্রনিকস, ভ্রমণ বা চিকিৎসার ব্যয়–সাশ্রয়ী কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ করে দিচ্ছে। এটি গ্রাহকদের মাসিক বাজেটে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। আমাদের তথ্য অনুযায়ী, ১০ থেকে ১৫ শতাংশ সচেতন গ্রাহক বর্তমানে ‘জিরো পার্সেন্ট ইন্টারেস্ট’ সুবিধার মাধ্যমে স্মার্টলি তাঁদের ব্যয় ব্যবস্থাপনা করছেন। সঠিক সময়ে কিস্তি পরিশোধের অভ্যাসই এই সেবাকে গ্রাহকদের কাছে জনপ্রিয় ও স্বস্তিদায়ক করে তুলেছে।
ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ার পথে বাধা
কিউআর কোড বা পস মেশিনে লেনদেন বাড়াতে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে এমটিবি দেশের প্রথম সফটপস সমাধান ‘মুঠো পে’ চালু করেছে। এর মাধ্যমে মার্চেন্টরা সাধারণ স্মার্টফোন ব্যবহার করেই কার্ড পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন। আমরা গ্রোসারি শপ, ড্রাইভার ও ডেলিভারি কর্মীদের এই সেবার আওতায় আনার কাজ করছি। তবে বড় বাধা হলো প্রান্তিক পর্যায়ে প্রযুক্তিগত সচেতনতার অভাব, ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য ও আস্থার ঘাটতি। এসব কাটিয়ে উঠতে দেশজুড়ে ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি প্রোগ্রাম নিয়ে কাজ চলছে।
তরুণ প্রজন্মের জন্য পরিকল্পনা
তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে এমটিবির বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে। সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, তরুণদের লাইফস্টাইলের সঙ্গে সংগতি রেখে আমরা বিশেষ কো–ব্র্যান্ডেড কার্ড চালুর পরিকল্পনা করছি। জনপ্রিয় ই–কমার্স প্ল্যাটফর্ম, রাইড শেয়ারিং ও ওটিটি সার্ভিসের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে আমাদের আকর্ষণীয় ক্যাশব্যাক ও রিওয়ার্ড পয়েন্ট অফার থাকছে। এ ছাড়া কন্ট্যাক্টলেস পেমেন্ট এবং গেমিং বা ট্রাভেল–সেন্ট্রিক ফিচার যুক্ত করার ওপর আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য হলো, সহজ ও স্মার্ট ব্যাংকিং সমাধানের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের গ্রাহকদের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতায় নতুন মাত্রা যোগ করা।



