খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি: ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিতে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা হুমকি

খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি: ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে

সরকার ও সময়ের পরম্পরায় আমরা যেন কিছুতেই খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। খেলাপি ঋণ বাড়ছে কিংবা ক্ষণিক কোনো কায়দায় (পুনঃ তফসিল বা পুনর্গঠন) কমানো হলেও আবার কোনো না কোনো সংকটের অজুহাতে বাড়ছে। আমরা বারবার শুনছি, এই মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংক খাতে বহুমাত্রিক ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। খেলাপি ঋণ ভালো সম্পদ খেয়ে ফেলছে, বাড়িয়ে তুলছে মন্দ সম্পদ। সার্বিকভাবে ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণ ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উদ্বেগ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনেও খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে ব্যাংক খাত ও সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে এসব মন্তব্য করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও ব্যাংকিং খাতের সুস্থতা বজায় রাখার জন্য খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণের স্থিতি থেকে আদায় করে মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়া খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের হারকে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ছিল ১৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং একই বছরের ডিসেম্বরে তা আবার কমে ৩১ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। আমরা জানি, ব্যাপকভাবে বিশেষ ছাড়ে খেলাপি ঋণ নবায়নের অবারিত সুযোগ দেওয়ায় এর পরিমাণ কিছুটা কমেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান ও কারণ

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শরিয়াহ ভিত্তিতে পরিচালিত কয়েকটি ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে। এ কারণে এসব ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ বেশি বেড়েছে, যা ব্যাংকগুলোর সুশাসনের অভাব ও দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনাকে ফুটিয়ে তুলছে। অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের মাত্রা খুবই কম। যে কারণে তাদের ঋণের ঝুঁকিও কম।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লুটপাটের ঋণখেলাপি হতে থাকায় গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এর পরিমাণ বেড়ে সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছিল। গত ডিসেম্বরে তা কিছুটা কমে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে। তিন মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে ৮৮ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ নবায়নে আরও কিছু নীতিমালা শিথিল করা হয়েছে। এখন চলতি মূলধন ঋণও খেলাপি হলে তা নবায়ন করা যাবে। ফলে মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ আরও কিছুটা কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি খাতে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ

প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় গত বছরের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এ খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২৩ দশমিক ৪০ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৪২ শতাংশ। এ খাতেই খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি হয়েছে পণ্য আমদানির নামে এলসি বা ঋণপত্র খুলে পণ্য দেশে না এনে বিদেশে টাকা পাচার করে। একই সঙ্গে আমদানি করা পণ্য বিক্রি করেও ব্যাংকের টাকা শোধ করা হয়নি।

এরপরই রয়েছে কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাত। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এ খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ২০ শতাংশ।

খেলাপি ঋণের নেতিবাচক প্রভাব

অভিযোগ রয়েছে, খেলাপি ঋণের বিপরীতে জামানতের পরিমাণ একেবারেই কম। যে কারণে আইনি উদ্যোগ সত্ত্বেও খেলাপি ঋণের সিংহভাগই মন্দ বা আদায়–অযোগ্য ঋণে পরিণত হয়েছে। এ ধরনের ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়। অর্থসংকটে অনেক ব্যাংকই চাহিদা অনুযায়ী প্রভিশন রাখতে পারছে না; যে কারণে ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান ক্রমেই কমে যাচ্ছে।

খেলাপি ঋণের বিপরীতে নির্ধারিত হারে প্রভিশন রাখতে হয়। এটি রাখতে গেলে মুনাফা থেকে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ আটকে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণ কম থাকলে মুনাফার একটি বড় অংশ দিয়ে পুনরায় ঋণ বিতরণ করা যেত। সেটি আর সম্ভব হয়ে ওঠে না খেলাপি ঋণের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে গিয়ে।

সৃষ্ট খেলাপি ঋণ কোনো না কোনো গ্রাহকের আমানত। ফলে আমানতের বিপরীতে গ্রাহককে নির্ধারিত হারে সুদ বা মুনাফা দিতে হচ্ছে। এতেও সুদ বা মুনাফার অর্থ ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংকের মুনাফা কমে যাচ্ছে। পুঁজিবাজারেও এই ব্যাংকগুলোর শেয়ার মূল্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও মুক্তির পথ

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিতে ব্যাংকগুলো ব্যর্থ হয়, এমনকি কিছু ব্যাংকের এলসি আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো গ্রহণ করে না বা কনফার্ম করে না। এতেও গ্রাহকের ক্রস–বর্ডার বা আন্তর্জাতিক লেনদেনের খরচ বেড়ে যায়। সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংশয় বাড়ে।

এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির পথ—বাণিজ্যিক ব্যাংকে গ্রাহকঝুঁকি–ব্যবস্থা উন্নীতকরণ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ হ্রাস এবং একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে রাজনৈতিক সুশাসন নিশ্চিতকরণ।