একীভূত ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ স্কিম
বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট স্কিম প্রণয়ন করেছে। এই স্কিম অনুযায়ী, আমানতকারীরা প্রথম দিন থেকেই ন্যূনতম দুই লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন এবং পরবর্তীতে প্রতি তিন মাস পরপর এক লাখ টাকা করে উত্তোলনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ২১ মাসের মধ্যে পুরো অর্থ তোলার সুযোগ পাবেন।
ব্রিফিংয়ে সহকারী মুখপাত্রের ঘোষণা
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) মতিঝিলে সেনা কল্যাণ ভবনে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিক গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে এই বার্তা দেন। তিনি জানান, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে একটি নির্দিষ্ট স্কিম প্রণয়ন করা হয়েছে এবং সেই অনুযায়ী ধাপে ধাপে আমানত ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম চলছে।
এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে একীভূত ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা বিক্ষোভ করেছিলেন। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত ফেরত পেতে আরও কিছুটা ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে শাহরিয়ার সিদ্দিক বলেন, "আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।"
বিভিন্ন ধরনের আমানতের জন্য আলাদা ব্যবস্থা
শুধু সাধারণ সঞ্চয়ী বা চলতি হিসাব নয়, এফডিআর (মেয়াদী আমানত) ও ডিপিএসসহ বিভিন্ন ধরনের আমানতের ক্ষেত্রেও অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়েছে। যেসব এফডিআর বা ডিপিএস মেয়াদপূর্তির সময়ে পৌঁছাবে, সেগুলো থেকে প্রাথমিকভাবে এক লাখ টাকা উত্তোলন করা যাবে। বাকি অর্থ নতুন করে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী নবায়ন করা হবে।
তিন মাস মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রে তিনবার নবায়নের সুযোগ থাকবে। ছয় মাস মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রে দুইবার এবং এক বছর বা দুই বছর মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পুনর্নবায়নের মাধ্যমে ধাপে ধাপে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ থাকবে। প্রতিবার নবায়নের সময় আমানতকারী তাদের মুনাফা তুলে নেওয়ার সুযোগ পাবেন, যদিও মূল অর্থ অপরিবর্তিত থাকবে।
অসুস্থ আমানতকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা
সাধারণ উত্তোলন সীমার বাইরে গুরুতর অসুস্থ বা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত আমানতকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। কিডনি রোগী বা অন্যান্য জটিল রোগে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিরা চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী সীমাহীন অর্থ তুলতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে চিকিৎসাসংক্রান্ত যথাযথ নথিপত্র জমা হবে।
এছাড়া অন্য যে কোনো অসুস্থতার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রশাসক সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুমোদন দিয়ে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দিতে পারবেন। যদি এর চেয়েও বেশি অর্থ প্রয়োজন হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট শাখার মাধ্যমে আবেদন করলে বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি বিবেচনা করে অতিরিক্ত অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করবে।
ব্যাংকের পুনর্গঠন ও প্রযুক্তিগত সমন্বয়
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন ব্যবস্থাপনা গঠনের প্রক্রিয়াও চলছে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগের জন্য ইতোমধ্যে নতুন করে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। আবেদনপত্র সংগ্রহ করে সেগুলো যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। সরকারের অনুমোদন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক শিগগিরই তা অনুমোদন দেবে। একইভাবে ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
পাঁচ ইসলামী ব্যাংক একীভূত হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হওয়ায় এখন মানবসম্পদ, শাখা এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার সমন্বয় করা হচ্ছে। অনেক এলাকায় একই স্থানে একাধিক ব্যাংকের শাখা রয়েছে। সেগুলোকে ধাপে ধাপে একীভূত করে একটি কার্যকর শাখায় রূপান্তর করা হবে, যাতে পরিচালন ব্যয় কমে এবং দক্ষতা বাড়ে।
এছাড়া পাঁচটি ব্যাংকে বর্তমানে পাঁচ ধরনের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব সফটওয়্যারকে একীভূত করে একটি সমন্বিত প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে আনার জন্য বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক চাইছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে একটি দক্ষ, লাভজনক এবং টেকসই ব্যাংকে পরিণত করতে।
শাহরিয়ার সিদ্দিক আরও বলেন, "যদি কোনো আমানতকারী নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী অর্থ তুলতে গিয়ে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হন, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে বা সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিষয়টি জানাতে পারবেন।"



