বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন: প্রশ্নের জালে স্বায়ত্তশাসন ও সংস্কারের ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বে আকস্মিক পরিবর্তন দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং নতুন গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা ও সমালোচনা।
পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই গভর্নর পদে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, নতুন সরকার এলে নতুন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু যেভাবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে তা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, সাবেক গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়ার পদ্ধতি ভালো ইঙ্গিত বহন করে না।
তিনি বলেন, "একজনকে সরিয়ে আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়া হলো, তার মানে আগে থেকেই সব প্রস্তুত ছিল। রাখতে না চাইলে ওনাকে আগে থেকেই বলে দিলে হতো।" এই মন্তব্য প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোরই প্রতিধ্বনি।
সংস্কার কার্যক্রমের অনিশ্চয়তা
ড. আহসান এইচ মনসুরের সময়ে আর্থিক খাতের সংস্কারে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও এখন উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি কাঠামো সংস্কার এবং ব্যাংক পুনর্গঠনের মতো পদক্ষেপগুলো বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, "রিফর্ম সব সময়ই জটিল। কারণ অনেক পক্ষ এটা পছন্দ করে না, এতে নাখোশ হয়। সেটাতে যদি সরকার প্রভাবিত হয়ে থাকে, সেটা দুঃখজনক।"
নতুন গভর্নর নিয়োগে 'স্বার্থের দ্বন্দ্ব' বিতর্ক
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ নিয়ে আলাদা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে তার ব্যবসায়িক পটভূমি। তিনি পোশাক, আবাসন ও ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকায় 'কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট' বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
এছাড়া দেশের একটি বেসরকারি ব্যাংকে তার নামে থাকা ঋণ পুনঃতফসিল করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, "তিনি হয়তো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থেকে সরলেন কিন্তু মালিকানা তো তারই। এছাড়া লোন পুনঃতফসিলের বিষয়টিও তো কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের জায়গা।"
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারির বিক্ষোভের মুখে গভর্নরের পরিবর্তন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুটি বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে যদি বিক্ষোভের মুখে বিদায় নিতে হয়, তবে তা প্রতিষ্ঠানের ভিতরেই গভীর সমস্যার ইঙ্গিতবাহী।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নীতিমালার অভাব
বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালিত হয় ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার অনুযায়ী, যেখানে গভর্নর নিয়োগে নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালার উল্লেখ নেই। ড. জাহিদ হোসেনের মতে, যোগ্য ব্যক্তিদের শর্টলিস্ট করে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়োগ ও বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল।
তিনি বলেন, "যোগ্য ব্যক্তিদের শর্টলিস্ট করে, তাদেরকে ডাকা হবে, তার মধ্য থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এটি না হলে নিয়োগ এবং বাতিলের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।"
সরকারের অবস্থান
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই পরিবর্তনকে খুবই স্বাভাবিক বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, "একটা নতুন সরকার এসেছে। নতুন সরকারের অগ্রাধিকার আছে। পরিবর্তন শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকেই হয়নি। এটা অনেক জায়গায় হচ্ছে এবং হতেই থাকবে।"
তবে অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পরিবর্তন কেবল একজন ব্যক্তির প্রস্থান বা আগমনের বিষয় নয়, এটি দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
