বাংলাদেশ ব্যাংকের 'মব' ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
বাংলাদেশ ব্যাংকে গত বুধবার সংঘটিত 'মব' ঘটনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, নতুন গভর্নরের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে এবং যারা এই 'মব' সংস্কৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নতুন গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ ও অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১১টার দিকে নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন। এ সময় তাকে স্বাগত জানান ডেপুটি গভর্নর ও প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গভর্নর সংক্ষেপে বলেন, 'আগে কাজ, পরে কথা।' এরপর তিনি ডেপুটি গভর্নর ও নির্বাহী পরিচালকদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন এবং বৈঠক শেষে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর দপ্তরে যান।
দায়িত্ব গ্রহণের পর গভর্নর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার অবস্থান ও পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন:
- বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা: গত দেড় বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় সহযোগিতা ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করা হবে।
- অর্থনীতিতে গতি ফেরানো: প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখাকে অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন গভর্নর।
- উচ্চ সুদের হার পর্যালোচনা: বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে এমন উচ্চ সুদের হার পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা
নতুন গভর্নর প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি নিয়মভিত্তিক ও বৈষম্যহীন করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি কাজের গতি বাড়াতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধির কথাও বলেন।
আরিফ হোসেন খান জানান, গভর্নর পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। সেই স্থিতিশীলতাকে ভিত্তি করে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। তিনি খাদের কিনারা থেকে ব্যাংকিং খাতসহ ভঙ্গুর অর্থনীতিকে রক্ষায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অর্থ উপদেষ্টা ও গভর্নর যেসব ভালো সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলো অব্যাহত রাখবেন বলে জানিয়েছেন।
'মব' ঘটনার পটভূমি ও অভিযোগ
উল্লেখ্য, গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে 'মব' তৈরি করে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্লোগান ও উত্তেজনার মধ্যেই তাকে গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়। তারা 'ধর ধর' বলে স্লোগান দেন এবং কেউ কেউ গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করেন।
এ সময় অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করেন এবং গালাগালি করেন। গভর্নর ভবনের মূল ফটকের সামনে ঘটা এই ঘটনার সময় পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, অতিরিক্ত পরিচালক তানভীর আহমেদ, প্রটোকল কর্মকর্তা হাসান আরিফসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে বুধবার বেলা ১১টার দিকে ড. আহসান এইচ মনসুরের পদত্যাগ দাবিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ সভা করেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশ। এই ঘটনাটিই পরবর্তীতে 'মব' ঘটনার সূত্রপাত ঘটায় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলে। নতুন গভর্নরের কঠোর অবস্থান ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি এই প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
