বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে সীমা লঙ্ঘন: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উদ্বেগ
বেসরকারি ব্যাংক ঋণ সীমা লঙ্ঘনে ঝুঁকিতে

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে সীমা লঙ্ঘন: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উদ্বেগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি একটি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নির্ধারিত ঋণ সীমার চেয়ে মাত্রাতিরিক্ত হারে ঋণ বিতরণ করে আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে। তাদের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের ফলে বিতরণ করা ঋণ আদায় করতে হিমশিম খাচ্ছে, যা খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়াও, ইমেজ সংকটের কারণে আমানত প্রবাহও চাহিদা অনুযায়ী বাড়াতে পারছে না ব্যাংকগুলো।

সরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর অবস্থান

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি খাতের এবং বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া সীমার মধ্যে থেকেই ঋণ বিতরণ করছে। কিন্তু বেসরকারি ও ইসলামী ব্যাংকগুলো এই নিয়ম মানছে না। তারা সীমার চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করেছে, এমনকি বাজার থেকে ধার করেও ঋণ বিতরণ করার নজির পাওয়া গেছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মাবলি

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ ব্যাংকগুলো তাদের মোট আমানতের সর্বোচ্চ ৮৩ শতাংশ ঋণ হিসাবে বিতরণ করতে পারে। বাকি ১৩ শতাংশ আমানত গ্রাহকদের নিরাপত্তার জন্য বিধিবদ্ধ আমানত হিসাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। অন্যদিকে, শরিয়াভিত্তিতে পরিচালিত ব্যাংকগুলোকে তাদের মোট আমানতের সাড়ে ৯ শতাংশ বিধিবদ্ধ আমানত হিসাবে রাখতে হয় এবং বাকি সাড়ে ৯০ শতাংশ অর্থ বিনিয়োগ হিসাবে বিতরণ করতে পারে।

বেসরকারি ও ইসলামী ব্যাংকগুলোর পরিসংখ্যান

প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো গড়ে তাদের মোট আমানতের ৯৪ দশমিক ১০ শতাংশ অর্থ ঋণ হিসাবে বিতরণ করেছে, যা নির্ধারিত সীমার চেয়ে ১১ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা আরও উদ্বেগজনক: তারা মোট আমানতের চেয়ে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেছে, অন্য ব্যাংক এবং বন্ড মার্কেট থেকে ধার করে বাড়তি অর্থ সংগ্রহ করে। ফলে, তাদের মোট আমানতের অনুপাতে ১২১ দশমিক ৮০ শতাংশ বিনিয়োগ করা হয়েছে, যা সীমার চেয়ে ৩১ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি।

ঝুঁকি ও নেতিবাচক প্রভাব

এই অতিরিক্ত ঋণ বিতরণের কারণে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে, যা তাদেরকে উচ্চ ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। তারা সময়মতো ঋণ আদায় করতে পারছে না, ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। এতে ব্যাংকিং খাতের সার্বিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতিদিনকার লেনদেন নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নিজেদের কাছে রাখার বাধ্যবাধকতাও অনেক ব্যাংক উপেক্ষা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রসঙ্গ ও লুটপাটের অভিযোগ

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শরিয়া ব্যাংকগুলোর বেশির ভাগই একটি গ্রুপ দখল করে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, যার মাধ্যমে ওইসব ব্যাংকে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া, বেসরকারি খাতের কয়েকটি ব্যাংকেও দখলের মাধ্যমে অনুরূপ লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনা ব্যাংকগুলোর সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ।