চামড়া শিল্পের সুরক্ষায় শুল্ক-ভ্যাট প্রত্যাহারের জোরালো দাবি
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত চামড়া শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ট্যানারি শিল্পে ব্যবহৃত ৪৩ প্রকার রাসায়নিক দ্রব্যের আমদানির উপর আরোপিত কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) যৌথভাবে এই দাবি উত্থাপন করেছে।
প্রাক-বাজেট বৈঠকে উদ্যোক্তাদের প্রস্তাবনা
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবনে বুধবার (৮ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত এক প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় এই দাবি উপস্থাপন করা হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে শিল্পপতিরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় উৎপাদন ব্যয় কমানো না গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ রপ্তানিমুখী ট্যানারিগুলোতে কাঁচামাল প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহৃত ৪৩ ধরনের রাসায়নিক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানির উপর সোর্স ট্যাক্স এবং ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মত দেন তারা। শিল্প মালিকরা আরও জানান, কাঁচামাল চামড়া একটি নশ্বর কৃষিপণ্য। গত বছরের ২৬ মে জারি করা একটি এসআরও অনুযায়ী কাঁচা চামড়া সরবরাহের উপর ৩% সোর্স ট্যাক্স আরোপ করা হয়েছে। এই কর বাতিল করে কাঁচা চামড়াকে আবারও করমুক্ত ঘোষণার দাবি জানানো হয় বৈঠকে।
ভ্যাট-মুক্ত সুবিধা ও প্রশাসনিক জটিলতা দূরীকরণের আহ্বান
উদ্যোক্তারা ২০১৯ সালের এনবিআর সার্কুলার অনুযায়ী শিল্প কারখানায় বিদ্যুৎ, পানি ও জ্বালানি ব্যবহারের জন্য ভ্যাট-মুক্ত সুবিধার কার্যকর নিশ্চয়তা দাবি করেন। পাশাপাশি এই সংক্রান্ত প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানি বন্ধেরও দাবি উঠে। বর্তমানে ট্যানারি শিল্পে ব্যবহৃত বেশিরভাগ রাসায়নিক, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও আনুষঙ্গিক সামগ্রী আমদানিনির্ভর বলে উল্লেখ করেন তারা।
এই পণ্য আমদানিতে শুল্ক, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, অগ্রিম আয়কর, অগ্রিম বাণিজ্য ভ্যাট ও সোর্স ট্যাক্সসহ মোট করের বোঝা ৩০% এর বেশি। যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতাকে কঠিন করে তুলছে। বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, রাসায়নিক আমদানিতে অ্যাড ভ্যালোরেম শুল্কের উপর ৫% অতিরিক্ত শুল্ক শর্তসাপেক্ষে মওকুফ থাকলেও এই খাতে ভ্যাটের হার এখনও ১৫% রয়েছে।
নতুন এসআরও জারির প্রস্তাব
এই পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা একটি নতুন এসআরও জারির প্রস্তাব দিয়েছেন, যেখানে অ্যাড ভ্যালোরেম শুল্কের ৩% এর বেশি অংশ মওকুফ করা হবে এবং রাসায়নিক আমদানিতে ভ্যাট ১৫% থেকে কমিয়ে ৭.৫% করা হবে। তাদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে নন-বন্ড ট্যানারি শিল্প আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে, অনিয়মিত বা পেঁচানো পথে রাসায়নিক আমদানির প্রবণতা হ্রাস পাবে এবং উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে। একইসাথে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে বলে মত দেন শিল্প প্রতিনিধিরা।
চামড়া শিল্পের টেকসই উন্নয়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ধারা অব্যাহত রাখতে কর ও ভ্যাট কাঠামো পুনর্বিন্যাসের এই দাবি এখন বাজেট প্রস্তুতির কেন্দ্রীয় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন যে, আসন্ন বাজেটে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতের দাবিগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হবে।



