রমজানে চট্টগ্রামের বাজারে ফলের দামে চাপ, ক্রেতারা হিমশিমে
পবিত্র মাহে রমজান ঘিরে চট্টগ্রামের বাজারে বিদেশ থেকে আমদানি করা এবং দেশি উভয় ধরনের ফলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ফল ক্রয় করতে গিয়ে সাধারণ ক্রেতারা ব্যাপকভাবে হিমশিম খাচ্ছেন। পাইকারি থেকে শুরু করে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত সব স্তরেই ফলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ইফতারের সময় ফল কেনার চাহিদা থাকা সত্ত্বেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
পাইকারি বাজারে দামের উল্লম্ফন
চট্টগ্রাম নগরের স্টেশন সড়কের ফলমন্ডি নামে পরিচিত পাইকারি বাজারে বিভিন্ন ফলের দামে তীব্র ওঠানামা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) পাইকারি বাজারে ১৫ কেজির মাল্টার একটি কার্টন বিক্রি হয়েছে তিন হাজার থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকায়, অর্থাৎ প্রতি কেজির দাম পড়ছে ২০০ থেকে ২৩৫ টাকা। একইভাবে, ১০ কেজির সবুজ আঙুরের কার্টন বিক্রি হয়েছে দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার টাকায়, যার ফলে প্রতি কেজির দাম দাঁড়িয়েছে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা। কালো আঙুরের ক্ষেত্রে ১০ কেজির কার্টন বিক্রি হয়েছে চার হাজার ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকায়, অর্থাৎ কেজিপ্রতি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।
চীন থেকে আমদানি করা ২০ কেজির আপেলের কার্টন বিক্রি হয়েছে চার হাজার ৫০০ থেকে ছয় হাজার টাকায়, যেখানে প্রতি কেজির দাম পড়ছে ২২৫ থেকে ৩০০ টাকা। আনারের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়াও ফ্রান্স, ইউক্রেনসহ অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করা ১৮ কেজির আপেলের কার্টন বিক্রি হয়েছে পাঁচ হাজার ৫০০ টাকায়, যার ফলে প্রতি কেজির দাম পড়ছে ২৭৮ টাকা। নয় কেজির নাশপাতির কার্টন বিক্রি হয়েছে তিন হাজার টাকায়, অর্থাৎ কেজিপ্রতি ৩৩৫ টাকা। আট কেজি কমলার কার্টন বিক্রি হয়েছে দুই হাজার টাকায়, যেখানে কেজিপ্রতি দাম পড়ছে ২৫০ টাকা। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিটি ফলের জাতেই ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
খুচরা বাজারে দাম বৃদ্ধির চিত্র
নগরীর বিভিন্ন খুচরা ফলের দোকানে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। রমজানের আগে আনারের কেজি বিক্রি হতো ৩৫০ টাকা, কিন্তু বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকা। চায়না কমলা এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হতো ২৫০ টাকা, এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকা। মাল্টা আগে বিক্রি হতো ৩০০ টাকা, এখন ৩৫০ টাকা। আপেল বিক্রি হতো ৩০০ টাকা, এখন ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। নাশপতি আগে ৪০০ টাকা বিক্রি হতো, এখন ৫০০ টাকা। কালো আঙুর আগে বিক্রি হতো ৪০০ টাকা, এখন ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা, সবুজ আঙুর আগে বিক্রি হতো ৩০০ টাকা, এখন ৪০০ টাকা। এই দাম বৃদ্ধি ক্রেতাদের জন্য ব্যাপক অসুবিধা সৃষ্টি করছে।
দাম বৃদ্ধির কারণ ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য
আমদানিকারক আঁখি এন্টারপ্রাইজের মালিক ও চট্টগ্রামের ফলমন্ডি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল আলম দাম বৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিদেশ থেকে ফল আমদানিতে দাম বেশি পড়ছে। আমরা বিদেশ থেকে প্রতি কেজি ফল এক ডলারের নিচে কিনতে পারি না। সেই ফল কেজিপ্রতি হিসাব করলে ডিউটি ও জাহাজ ভাড়া মিলিয়ে ১ ডলার পরিশোধ করতে হয়। প্রতি কেজি আমদানি মূল্যের সমান যদি শুল্কহার হয় দেশে কম দামে ফল বিক্রির সুযোগ নেই।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমদানি করা ফলকে বিলাসী পণ্য হিসেবে বিবেচিত করেছে সরকার। এ কারণে গাড়ি, মদ-সিগারেটের পর তাজা ফল আমদানিতে সবচেয়ে বেশি শুল্ককর দিতে হয়। প্রতিটি জাতের ফলের আমদানি ডিউটি অনেক বেশি। এ কারণে বাজারে আমদানি করা বিদেশি ফলের দাম তুলনামূলক অনেক বেশি।’
খুচরা ব্যবসায়ীরাও তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারের ফল ব্যবসায়ী নুরুল আবছার বলেন, ‘পাইকারি বাজারের চেয়ে খুচরাই বিদেশি ফলের দাম কিছুটা বাড়তি থাকে। কারণ আমরা পাইকারিতে বেশি দামে কিনে খুচরাই বেশি দামে বিক্রি করছি। এতে কিছু ফল পচা ও নষ্ট থাকে। তার ওপর পরিবহন খরচ আছে। সব হিসাব করে আমাদের বিক্রি করতে হয়। তবে ফলের দাম বাড়ায় এখন ক্রেতাও কম।’ অন্য একজন খুচরা বিক্রেতা জানান, পাইকারি বাজারেই দাম বেশি এবং এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, দোকানের ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি ও পচনশীল পণ্যের ঝুঁকি যুক্ত হয়, যা দাম বাড়ানোর অন্যতম কারণ।
আমদানি পরিসংখ্যান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহআলম প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, এবার রমজান ঘিরে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে তাজা ফল আমদানি হচ্ছে, তবে আগের চেয়ে কম। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আপেল আমদানি হয়েছে ৮৪ হাজার ৬৪৮ টন, একই সময়ে কমলা ও মাল্টাসহ আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৮০৯ টন, আঙুর ৩৯ হাজার ৭৬৩ টন, নাশপাতি ৪ হাজার ১৮ টন এবং খেজুর ৫৬ হাজার ২৯৮ টন।
উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের তথ্য আরও নির্দেশ করে যে, ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদেশি ফল আমদানি হয়েছে পাঁচ লাখ ছয় হাজার মেট্রিক টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে তিন লাখ ৭৮ হাজার মেট্রিক টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে তিন লাখ ৩৯ হাজার ৮৯৪ টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) আমদানি হয়েছে এক লাখ ৫৪ হাজার ৪২৬ টন। চীন, থাইল্যান্ড, ভুটান, মিশর, ব্রাজিল, তিউনিসিয়া, পর্তুগাল, নিউজিল্যান্ড, আফগানিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ফ্রান্স থেকে ফল আমদানি করা হয়।
ব্যবসায়ীরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, রোজায় চাহিদা বাড়ার কারণে দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হলেও প্রতিদিন ফলের চালান আসছে এবং কয়েক দিনের মধ্যে দাম কিছুটা সমন্বয় হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের জন্য ফল কেনা একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা রমজানের সময় ইফতারের প্রস্তুতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
