রমজানে পণ্য সরবরাহে চাপ, আমদানি বাড়লেও বাজারজাতকরণে বাধা
রমজানে পণ্য সরবরাহে চাপ, আমদানি বাড়লেও বাধা

রমজানে পণ্য সরবরাহে চাপ, আমদানি বাড়লেও বাজারজাতকরণে বাধা

পবিত্র রমজান মাস শুরু হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বাড়ার প্রেক্ষাপটে শেষ মুহূর্তে বেশির ভাগ পণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মাসের শুরুতেই চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক আন্দোলন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ছুটির কারণে পণ্য সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, রোজার কেনাকাটা বাড়ার এই সময়ে বাজারজাতে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। অন্যথায় পণ্যমূল্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা প্রবল।

আমদানি বৃদ্ধি ও সরবরাহে বাধা

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রোজার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে মটর ডাল ছাড়া ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল, গমের আমদানি গতবারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। খেজুরের আমদানি আড়াই শতাংশ কমলেও হিমাগারে গতবারের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। অর্থাৎ মটর ডাল বাদে বাকি সব পণ্যের আমদানি পরিস্থিতি ইতিবাচক।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এবার রোজার পণ্যের আমদানি ডিসেম্বর মাস থেকেই শুরু হয়েছিল। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে সর্বোচ্চ আমদানি কার্যক্রম চলমান ছিল। কিন্তু এই সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক আন্দোলনের কারণে পণ্য খালাস প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। পাশাপাশি লাইটার জাহাজের সংকটের কারণে খালাস হওয়া পণ্য কারখানায় পৌঁছাতে দেরি হয়। ফলে কারখানায় রোজার পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে পাইকারি বাজারে পৌঁছাতে বিলম্ব ঘটে।

নির্বাচনী ছুটির প্রভাব

১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকেরা তিন দিনের ছুটি পেয়েছেন। সাপ্তাহিক ছুটিসহ মোট পাঁচ দিনের এই ছুটিতে অনেক শ্রমিক ও গাড়িচালক বাড়িতে চলে যান। এতে পণ্য পরিবহনকারী গাড়ির সংকট তৈরি হয় এবং কারখানা থেকে সরবরাহও ব্যাহত হয়। ছুটি শেষে শ্রমিক ও চালকেরা ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করলেও কয়েক দিন পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাজারজাতে চাপ বাড়িয়েছে।

নিত্যপণ্যের শীর্ষ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, "রোজার পণ্যের আমদানি অনেক বেড়েছে এবং কারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণও চলছে। সংকটের কোনো সুযোগ নেই। তবে সামনের এক সপ্তাহ কারখানা থেকে বাজারজাতে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। তাহলে দেশের সব জায়গায় সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে।"

পণ্য অনুযায়ী আমদানি পরিসংখ্যান

ভোজ্যতেল: গত আড়াই মাসে (১ ডিসেম্বর থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি) প্রধান দুই ভোজ্যতেল সয়াবিন ও পাম তেল আমদানি হয়েছে ৫ লাখ ৭৪ হাজার টন, যা গত রোজার আগের একই সময়ের তুলনায় ২৪ হাজার টন বেশি। সয়াবিনবীজের আমদানি ১৫ শতাংশ বেড়ে ৬ লাখ ৭৪ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। রোজায় ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় তিন লাখ টন, যা আমদানির তুলনায় কম।

চিনি: রমজান মাসে চিনির চাহিদা প্রায় তিন লাখ টন বলে ধারণা করা হয়। গত আড়াই মাসে চিনি আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৭৩ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৯ শতাংশ বেশি।

মসুর ডাল: গত আড়াই মাসে ২ লাখ ২৯ হাজার টন মসুর ডাল আমদানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৩ শতাংশ বেশি।

ছোলা: রোজায় ছোলার চাহিদা থাকে প্রায় এক লাখ টন। গত আড়াই মাসে ছোলা আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার টন, যা স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় বেশ ভালো।

মটর ডাল: এবার রোজার পণ্যের মধ্যে মটর ডালের আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। গত আড়াই মাসে মটর ডাল আমদানি হয়েছে ৬৬ হাজার টন, যা গতবারের একই সময়ের তুলনায় ৮১ শতাংশ কম। এই পণ্যটির দাম ইতিমধ্যে কিছুটা বেড়েছে।

খেজুর: গত আড়াই মাসে ৩৯ হাজার টন খেজুর আমদানি হয়েছে, যা গতবারের তুলনায় আড়াই শতাংশ কম। তবে গত বছর আমদানি বেশি হওয়ায় হিমাগারে খেজুরের মজুত রয়েছে, ফলে সংকটের শঙ্কা কম।

বাজারজাতে বিশেষ নজরের আহ্বান

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "রোজার পণ্যের উৎপাদন ও আমদানি চাহিদার তুলনায় সামঞ্জস্যপূর্ণ আছে। তবে এবার নির্বাচনের কারণে বাজারজাতকরণে ব্যত্যয় হয়েছে। এ জন্য আগামী কয়েক দিন কারখানা বা গুদাম থেকে রোজার পণ্য বাজারজাতকরণে বিশেষ নজর রাখা দরকার। তাহলে মূল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।"

সামগ্রিকভাবে, রমজান মাসে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানি বৃদ্ধি ইতিবাচক সংকেত দিলেও বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ায় সতর্কতা ও তদারকি অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।