স্নেহাশীষ বড়ুয়া
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আংশিক রপ্তানিকারক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক–কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুবিধা দিয়েছে। এনবিআরের এই উদ্যোগ রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনবে বলে আশা করা যায়। বিদ্যমান বন্ড ব্যবস্থাপনার জটিলতার কারণে অনেক আংশিক রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স বা সনদ নিতে পারে না। নতুন এই নীতি তাদের শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি সহজ করবে, যা রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে মনে করি।
কারা এ সুবিধা পাবে
এ নীতিমালার অধীনে বেশ কিছু খাত কাঁচামাল আমদানিতে সুবিধা পাবে। যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিল্প আমদানি নিবন্ধন সনদ থাকে এবং প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট পরিপালনকারী হয়। যেসব খাত এ সুবিধা পাবে, তার মধ্যে রয়েছে ফার্নিচার বা আসবাবশিল্প, ইলেকট্রনিকস, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং বা হালকা প্রকৌশলশিল্প, ইস্পাতপণ্য উৎপাদনকারী শিল্প, প্লাস্টিক খাত, চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী এবং তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান।
রপ্তানির শর্ত
এনবিআরের দেওয়া সুবিধা পেতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি অবশ্যই ব্যাংকের ঋণপত্র বা এলসি, টিটি বা বিক্রয়চুক্তির মাধ্যমে হতে হবে। এ ছাড়া বিক্রয়চুক্তি অবশ্যই লিয়েন ব্যাংকের পক্ষ থেকে অনুমোদিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মূসক বা ভ্যাট কমিশনারেটে জমা দিতে হবে। আর রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম মূল্য সংযোজন ৩০ শতাংশ হতে হবে।
আমদানিনিষিদ্ধ পণ্য
ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি–সুবিধার আওতায় কিছু পণ্য আমদানি করা যাবে না বলেও জানিয়েছে এনবিআর। আমদানিনিষিদ্ধ এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে সিমেন্ট, প্রি-ফ্যাব ভবন, এমএস রড, বার, পার্টিক্যাল বোর্ড, তার, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, এয়ারকন্ডিশনার, ফার্নিচার, অফিস সরঞ্জাম ও জ্বালানি।
সুবিধা পেতে যা করতে হবে
রপ্তানি আদেশ পাওয়ার পর উপকরণ-উৎপাদন সহগ অবশ্যই এনবিআরের ছকের সংযুক্তি ১ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মূসক কমিশনারেটে জমা দিতে হবে। জমা দেওয়া সংযুক্তি ১ সংশ্লিষ্ট মূসক কমিশনারেট থেকে অনুমোদিত হতে হবে। আমদানি শুল্কায়নের সময় সত্যায়িত সংযুক্তি ১ এবং মূসক ১৮ দশমিক ৪ জমা দিতে হবে। ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিতে হবে। আমদানি সম্পন্ন হওয়ার পর আমদানি–সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র সংশ্লিষ্ট মূসক কমিশনারেটে জমা দিতে হবে। একই এলসির অধীনে একাধিকবার আমদানি করা যেতে পারে, তবে তা স্থানীয় ব্যবহারের জন্য করা যাবে না। আমদানি করা কাঁচামালের ব্যবহার মাসিক ভ্যাট রিটার্নের মাধ্যমে সংযুক্তি ২ অনুযায়ী জমা দিতে হবে। বিক্রয় ও ক্রয় রেজিস্টার সংযুক্তি ৩ অনুযায়ী সংরক্ষণ করতে হবে। রপ্তানি সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র মূসক কমিশনারেটে জমা দিতে হবে।
ব্যাংক নিশ্চয়তা কখন নগদায়ন করা যাবে
সংশ্লিষ্ট মূসক কমিশনারেট দাখিল করা দলিলপত্র যাচাই সাপেক্ষে অনাপত্তি সনদ দেবে। এরপর সংশ্লিষ্ট কাস্টম হাউস বা শুল্ক স্টেশন ব্যাংক গ্যারান্টি মুক্ত করবে।
সময়সীমা ও পরিণতি
- এ সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে তা থেকে উৎপাদিত পণ্য ৯ মাসের মধ্যে অবশ্যই রপ্তানি করতে হবে।
- সংশ্লিষ্ট মূসক কমিশনারেট যৌক্তিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেই সময় আরও ৩ মাস বাড়াতে পারবে।
- উল্লিখিত সময় পার হলে অথবা আদেশ বাতিল হলে অথবা রপ্তানিতে ব্যর্থ হলে ব্যাংক গ্যারান্টি বাজেয়াপ্ত হবে।
সরকারের তথা এনবিআরের এ ধরনের উদ্যোগ আমাদের রপ্তানি ঝুড়িতে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ উদ্যোগের সুফল পেতে হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাকেও সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি রপ্তানিকারকদেরও নিয়মকানুনগুলো যথাযথভাবে পালন করা জরুরি। এনবিআর যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি বহুদিনের আকাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ। তাই আশা করছি, এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার ধীরে ধীরে অনেক ম্যানুয়াল প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করবে। যাতে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের কমপ্লায়েন্স বা পরিচালন খরচ কমে এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য আসে। এর সুফল পাওয়া গেলে তাতে রপ্তানির ঝুড়িতে নতুন রপ্তানি পণ্য যুক্ত হবে।
স্নেহাশীষ বড়ুয়া, পরিচালক, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস



