দশ বিশ্বকাপের পথিক তপন চৌধুরী: ফুটবলের প্রতি নিবেদিত এক যাত্রা
দশ বিশ্বকাপের পথিক তপন চৌধুরী: ফুটবলের প্রতি নিবেদিত

স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন চৌধুরী ১৯৮৬ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা দশটি ফুটবল বিশ্বকাপ দেখার বিরল গৌরব অর্জন করেছেন। শুধু ব্যবসায়ী বা ক্রীড়া সংগঠক নন, তিনি বিশ্বকাপ ফুটবলের এক নিবেদিত পথিক। তাঁর বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল মেক্সিকো থেকে, যখন চারদিকে নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা থাকা সত্ত্বেও বন্ধু ফকির মাহবুব আনাম (বর্তমান ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী) কে নিয়ে উড়ে গিয়েছিলেন ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ দেখতে।

১৯৮৬: মেক্সিকো থেকে শুরু

১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে তপন চৌধুরী ও তাঁর বন্ধু মিলে সাতটি ম্যাচ দেখেছিলেন, যার খরচ হয়েছিল প্রায় ১৮শ মার্কিন ডলার। সেই সময় মেক্সিকো নিয়ে নানা আতঙ্ক ছিল, কিন্তু ভয় তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি। তিনি এখনও স্পষ্ট মনে করতে পারেন সেই দিনটি, যখন দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল। সেদিন পুরো মেক্সিকো যেন উৎসবে ভেঙে পড়েছিল—রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ, আনন্দ, উচ্ছ্বাস। পরে হোটেলে ফিরে টেলিভিশনে দেখেন ম্যারাডোনার বিখ্যাত হাতের গোল, যা মাঠে বসে কেউ বুঝতে পারেননি।

প্রতি বিশ্বকাপে নতুন অভিজ্ঞতা

১৯৯০ সালে রোমে দেখেছেন ম্যারাডোনার কান্না আর জার্মানির ট্রফি জয়। ১৯৯৪ সালে আমেরিকার গরমে ফুটবলের ভাষা বদলে যাওয়া আর পেনাল্টিতে ইতালির স্বপ্নভঙ্গ। ১৯৯৮ সালে প্যারিসে তরুণ ফরাসি দলের উত্থান, যখন পুরো স্টেডিয়াম জিদানের নামে কাঁপছিল। ২০০২ সালে এশিয়ায় ব্রাজিলের পুনর্জন্ম, রোনালদো যেন হারানো সময় ফিরে পেয়েছিলেন। ২০০৬ সালে বার্লিনের ফাইনালে এক মহাতারকার বিদায়। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ভুভুজেলা আর স্পেনের ধৈর্যের ফুটবল। ২০১৪ সালে রিওতে ব্রাজিল-জার্মানির সেই অবিশ্বাস্য ম্যাচ, যেখানে তিনি পাশের লোককে বলে ফেলেছিলেন, “আজ ব্রাজিল সাত গোল খাবে।” পরে তিনি হেসে বলেন, “আমি জ্যোতিষী ছিলাম না। শুধু মনে হয়েছিল ব্রাজিল সেদিন আর মাঠে ছিল না।” ২০১৮ সালে দেখেছেন নতুন প্রজন্মের উত্থান। আর ২০২২ সালে কাতারের সেই রাত, যেখানে লিওনেল মেসি ট্রফি তুললেন আর গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে মানুষ দেখল সময়কে পূর্ণ হতে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ব্যক্তিগত ক্ষতি ও অবিচল ভালোবাসা

তপন চৌধুরীর জন্য বিশ্বকাপ শুধু ফুটবল নয়, পরিবারের উৎসবও ছিল। প্রতি আসরেই তাঁর সঙ্গে ছেলে ড্যানি বা মেয়ে বা পরিবারের কেউ না কেউ থাকতেন। কিন্তু এবার যাত্রার আগে একটি অনুপস্থিতি তাঁকে অন্যরকমভাবে স্পর্শ করছে। তাঁর ছেলে ড্যানি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। কথা বলতে বলতে থেমে যান তপন চৌধুরী, বলেন, “ছেলেটাকে খুব মিস করেন।” বাবা-ছেলে একসঙ্গে গ্যালারিতে বসে খেলা দেখতেন, গোল হলে উঠে দাঁড়াতেন, ছবি তুলতেন, তর্ক করতেন, ফিরে এসে রাতভর আলোচনা করতেন। এখন সেই আসন খালি।

দশম বিশ্বকাপের প্রস্তুতি

বিশ্বকাপ থেমে থাকে না। জীবনও না। তপন চৌধুরী আবার যাচ্ছেন আরেকটি বিশ্বকাপ দেখতে। এবার তাঁর ব্যাগে থাকবে শুধু টিকিট আর পাসপোর্ট নয়, থাকবে ১৯৮৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত অসংখ্য ফাইনালের আলো, হাজারো গ্যালারির শব্দ, আর এক না-ফেরা সঙ্গীর জন্য গভীর, নীরব এক অপেক্ষা।