মেসির মায়ামিতে কেপ ভার্দের চ্যালেঞ্জ, বিশ্বকাপের অঘটনের ইঙ্গিত
মেসির মায়ামিতে কেপ ভার্দের চ্যালেঞ্জ, বিশ্বকাপের অঘটনের ইঙ্গিত

বিশ্বকাপের মাঝেই লিওনেল মেসি ঘরে ফিরেছেন—না, বিশ্রাম নিতে নয়, বরং শেষ ৩২-এর ম্যাচ খেলতে। শহরের নাম রোজারিও নয়, মায়ামি। প্রতিপক্ষ কেপ ভার্দে, নামে ছোট হলেও স্বপ্নে বিশাল। কাগজে–কলমে এবারের বিশ্বকাপে এটাই এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার সবচেয়ে সহজ ম্যাচ হওয়ার কথা। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা নিখুঁত গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে এসেছে—তিন ম্যাচে তিন জয়, ৮ গোল, মাত্র ১ গোল হজম। অন্যদিকে কেপ ভার্দে বিশ্বকাপে এবারই প্রথম। তবে প্রথমবার এসেই তারা ইতিহাস লিখেছে, গ্রুপে কোনো ম্যাচ না হেরে নকআউটে জায়গা করে নিয়েছে।

কেপ ভার্দের স্বপ্ন ও সাহস

ফুটবল কখনো কখনো কাগজের গল্প শোনে না। কেপ ভার্দেও সেটাই বিশ্বাস করে। তাদের সহকারী কোচ উম্বের্তো বেতেনকোর্ত বলেছেন, ‘পরিসংখ্যান শুধু তত্ত্ব। আসল খেলা মাঠের চার দাগের ভেতরে হয়।’ এ কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে তাদের সাহস ও সংকল্প। স্পেন আর উরুগুয়ের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে ড্র করে তারা নকআউটে এসেছে। এখন আর ভয় নেই। কেপ ভার্দের স্বপ্নের ক্যানভাস বরং এখনো আরও বড়। কেপ ভার্দে ছোট্ট এক দ্বীপরাষ্ট্র, জনসংখ্যা কম। কিন্তু তাদের ফুটবল দলটা যেন পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে জোড়া লাগানো এক মানচিত্র—নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র—বিভিন্ন দেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়েরা একসঙ্গে এসে তৈরি করেছেন এক অদ্ভুত রসায়ন।

মেসির মায়ামি অধ্যায়

আর্জেন্টিনার গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে মূলত একজন মানুষ—লিওনেল মেসি। মায়ামি এখন তাঁর ঘর। তিন বছর আগে যখন এখানে আসেন, কেউ ভাবেনি, এই শহরেই তিনি বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে নামবেন। ৩৯ বছর বয়সেও ইতিহাস লিখছেন। গ্রুপ পর্বেই ৬ গোল। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৯ গোল তাঁর। আছে টানা ৭ ম্যাচে গোল করার রেকর্ড। সংখ্যাগুলো নিছক সংখ্যা নয়, এগুলো ঘোষণা করে বিরুদ্ধ স্রোতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের অস্তিত্ব। কানসাস সিটি থেকে মায়ামিতে যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে তাঁকে মেটাল ডিটেক্টরের তল্লাশির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে আর সবার মতোই। সেখানে ছিল হাসি, ঠাট্টা, হালকা মুহূর্ত। ফুটবল–সম্রাটও কখনো কখনো খুব সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠেন। কিন্তু মাঠে নামলে তিনি আর সাধারণ থাকেন না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্কালোনির শততম ম্যাচ

আরেকজন অসাধারণ মানুষ আছেন এই আর্জেন্টিনায়—লিওনেল স্কালোনি। ২০১৮ সালে অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া এই মানুষটির কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। সেই মানুষই আজ আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল সময়ের স্থপতি। কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা, বিশ্বকাপ—সব জিতেছেন। বাংলাদেশ সময় আগামীকাল ভোর ৪টায় আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে তাঁর ১০০তম ম্যাচ। প্রথম নিরানব্বই ম্যাচে ৭২ জয়, ১৮ ড্র আর মাত্র ৯ হার। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের নভেম্বর—টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ডও তাঁর। মেসির সঙ্গে তাঁর রসায়নটাও চোখে পড়ার মতো। স্কালোনির অধীন মেসি ৭৪ ম্যাচে করেছেন ৫৮ গোল, প্রতি ম্যাচে গড়ে ০.৭৮টি। স্কালোনির আগে ১২৮ ম্যাচে ৬৫ গোল, গড়ে ০.৫১। সংখ্যাগুলোই বলে দেয়, এই কোচের অধীন মেসি নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

একাদশ সাজানোর ধাঁধা

একাদশ সাজাতে গিয়ে স্কালোনির কপালে কয়েকটা ভাঁজ এখনো আছে। রক্ষণে নিকোলাস তাগলিয়াফিকো নাকি ফাকুন্দো মেদিনা, সেন্টারব্যাকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো সুস্থ হয়ে ফিরবেন নাকি নিকোলাস ওতামেন্দিই থাকবেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পাশে—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে ম্যাচের আগের দিন শেষ অনুশীলনের পর। আক্রমণে সবচেয়ে বড় ধাঁধা লাওতারো মার্তিনেজ আর হুলিয়ান আলভারেজকে নিয়ে। জর্ডান ম্যাচে পেনাল্টি থেকে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল পাওয়া লাওতারোই সামান্য এগিয়ে। নাহুয়েল মলিনা আর লিসান্দ্রো মার্তিনেজের জায়গা প্রায় নিশ্চিত, মাঝমাঠে রদ্রিগো দি পল, আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ আর থিয়াগো আলমাদার নামও।

অঘটনের সম্ভাবনা

স্কালোনি জানেন, এ ম্যাচে ভুলের সুযোগ নেই। কারণ, ইতিহাস বলে, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলো ঠিক এমন জায়গাতেই ঘটে, যেখানে সবকিছু খুব সহজ মনে হয়। কেপ ভার্দেও জানে, তারা কী করতে চায়। সহকারী কোচ বেতেনকোর্ত বলেছেন, মেসিকে আটকানোর কোনো বিশেষ পরিকল্পনা নেই তাঁদের, ‘আমরা মেসিকে এমন একজন খেলোয়াড় মনে করি, যিনি ম্যাচের ফল ঠিক করে দিতে পারেন। কিন্তু আমরা তাকাই দলের দিকে, কোথায় জায়গা তৈরি হতে পারে, কীভাবে মেসির জন্য সেই জায়গা খুলে যেতে পারে।’ আর মেসি? নিজের শহরে, নিজের ঘরের উঠানে আরও একবার প্রমাণের মঞ্চে দাঁড়াবেন তিনি। বয়স যতই ছাপ ফেলুক, বলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে এখনো তরুণ্যের সতেজতা। সেই মেসিকে থামাতে একটা ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রের গোটা স্বপ্ন এখন জড়ো হচ্ছে আটলান্টিকের এপার থেকে ওপারে।