ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর বিতর্কিত সিদ্ধান্ত: ট্রাম্পের ফোনেই বদলে গেল বিশ্বকাপের নিয়ম
ইনফান্তিনোর বিতর্কিত সিদ্ধান্ত: ট্রাম্পের ফোনে বদলে গেল বিশ্বকাপের নিয়ম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিশ্বকাপ ফুটবলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ২০১৬ সালে ফিফা সভাপতি নির্বাচিত হওয়া ইনফান্তিনো আগামী বছর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে অংশ নেবেন। কিন্তু তাঁর মেয়াদকাল ক্রমশ বিতর্কিত হয়ে উঠছে ফিফা শান্তি পুরস্কার, বিশ্বকাপে টিকিটের আকাশচুম্বী দাম এবং ক্লাব বিশ্বকাপের মতো ইস্যুতে। সর্বশেষ বিতর্কটি যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত নিয়ে।

ট্রাম্পের ফোনে বদলে গেল নিয়ম

বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী, লাল কার্ডের বিরুদ্ধে কোনো আপিলের সুযোগ নেই। পরবর্তী ম্যাচে খেলোয়াড়কে ডাগআউটেই থাকতে হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ফোনেই সবকিছু বদলে যায়। বালোগানের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পর ফিফা ৮৭১ শব্দের একটি বিবৃতি প্রকাশ করে, যেখানে এ সিদ্ধান্তের স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। তবে ট্রাম্প নিজেই এর পেছনের রহস্য ফাঁস করে দিয়েছেন। ‘আমিই তাদের দিয়ে এটা করিয়েছি’—ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোকে ফোন করেছিলেন কি না, জানতে চাইলে এমন মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ইনফান্তিনো কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু মানুষ বিষয়টিকে এভাবে দেখছেন না। এই সিদ্ধান্তের সুবিধা পেয়েছে স্বাগতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যার নেতৃত্বে আছেন ট্রাম্প। আর ট্রাম্প হলেন এমন একজন মানুষ, যিনি ইনফান্তিনোকে নিজের ‘বন্ধু’ বলেই ডাকেন। ফলে এই নিষেধাজ্ঞা বাতিলের ঘটনাটি অনেকটা রাষ্ট্রপতির ক্ষমা ঘোষণার মতোই লেগেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফিফার নিয়মে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে ফিফার নিয়মকানুন অত্যন্ত স্পষ্ট। এতে কোনোভাবেই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অনুমতি নেই। জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোতে সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে বিভিন্ন দেশ নিয়মিতই আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ হয়। যেমন পাকিস্তান, গত আট বছরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে তিনবার দেশটিকে নিষিদ্ধ করে ফিফা। কিন্তু যখন ইনফান্তিনো ও ট্রাম্পের প্রসঙ্গ আসে, তখন কি নিয়মগুলো বদলে যায়?

বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ দেওয়া হয়েছিল। তখনই এ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। অনেকে বলেছেন, এটা দুই বন্ধুর ভালোবাসার ফল। ট্রাম্পের জন্যই প্রথমবার এই পুরস্কার চালু করা হয়েছে। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘ফেয়ারস্কয়ার’ গত ডিসেম্বরে ফিফার নৈতিক কমিটির কাছে অভিযোগ করেছিল, ইনফান্তিনো এই পুরস্কার তৈরি করে ফিফার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার নিয়ম লঙ্ঘন করেছেন। কিন্তু সেই অভিযোগের কোনো জবাব মেলেনি। এরপর গত মাসে ৫০ জন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য নৈতিক কমিটিকে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে নতুন একটি চিঠি পাঠান। ফিফার অন্যান্য অনেক ঘটনার মতোই এবারও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

বিশ্বকাপে পর্দার আড়ালে বিতর্ক

দুই বছর আগে ২০৩০ ও ২০৪০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজক নির্ধারণের অদ্ভুত প্রক্রিয়াটির দিকে নজর দেওয়া যাক। ফিফা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ তিনটি মহাদেশে (আফ্রিকা, ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকা) আয়োজন করা হবে। এর মানে দাঁড়ায়, ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করার সুযোগ পাবে শুধু এশিয়া বা ওশেনিয়া অঞ্চলের কোনো দেশ। আসলে কোনো প্রতিযোগী না থাকায়, এই নিয়মের কারণে পরোক্ষভাবে সৌদি আরবের বিশ্বকাপ আয়োজন নিশ্চিত হয়ে যায়। ইনফান্তিনোর আমলে সৌদি আরব ও ফিফার মধ্যে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বলেই সৌদি নাকি এ সুযোগ পেয়েছে বলে আলোচনা আছে।

নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশন এই প্রক্রিয়ায় ভোট দেয়নি। তাদের যুক্তি ছিল, এই আয়োজক খোঁজার প্রক্রিয়াটি ফিফার ‘ভালো শাসনের সংস্কারকে বাধা দিয়েছে এবং ফিফার ওপর মানুষের বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।’ ক্লাব বিশ্বকাপের কথাও বলা যায়। ক্লাব ফুটবলের বিশাল আয়ের একটা অংশ নিজেদের করে নিতে ফিফা টুর্নামেন্টটি চালু করেছে, যা ফুটবলাররা একদমই চাননি। ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘ফিফপ্রো’-এর সভাপতি সার্জিও মার্চি গত বছর বলেছিলেন, এই টুর্নামেন্টটি তৈরি করা হয়েছে কোনো আলোচনা ছাড়াই।

উয়েফা–ইনফান্তিনো লড়াই কি আসন্ন

ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা গত মঙ্গলবার বালোগানের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বলেছে, ফিফা এখানে ‘সব সীমা লঙ্ঘন করেছে’ এবং একে একটি ‘নজিরবিহীন বোধগম্যতাহীন ও অন্যায় সিদ্ধান্ত’ বলে অভিহিত করেছে। উয়েফা এবারই প্রথম ফিফার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, তা নয়। ২০২৫ সালের মে মাসে উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিনের নেতৃত্বে একদল ইউরোপীয় প্রতিনিধি ফিফা কংগ্রেসের একটি বিরতির সময় সভাকক্ষ থেকে ওয়াকআউট করে। ইনফান্তিনো তখন ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের এক কূটনৈতিক সফর শেষে ২ ঘণ্টা ১৭ মিনিট দেরিতে সভায় এসেছিলেন।

চলমান বিশ্বকাপেও উয়েফা কিছু চাল চালার চেষ্টা করেছে। গত মাসে সোমালি রেফারি আরতান দেশে ফেরার পরপরই উয়েফা ঘোষণা করে, আগামী ১২ আগস্ট পিএসজি ও অ্যাস্টন ভিলার মধ্যকার উয়েফা সুপার কাপ ম্যাচটি পরিচালনার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তা ছাড়া বছরজুড়েই উয়েফা বেশ জোর দিয়ে প্রচার করছে যে বিশ্বকাপের তুলনায় ইউরো ২০২৮-এর টিকিটের দাম কত কম। এমনকি তারা ম্যাচে কোনো হাইড্রেশন ব্রেক কিংবা মুখ চেপে ধরা খেলোয়াড়দের লাল কার্ড দেওয়ার মতো নিয়ম চালু করবে না।

ইনফান্তিনোর পায়ের নিচে মাটি কতটা শক্ত

ইনফান্তিনোর অবস্থান কি সত্যিই নড়বড়ে হয়ে পড়েছে? না, বিশ্বের অনেক ফুটবল ফেডারেশনের কাছে ইনফান্তিনো এখনো দারুণ জনপ্রিয়, আর এর বড় কারণ ফুটবলের উন্নয়নে ফিফার ভূমিকা। ইনফান্তিনোর ‘ফিফা ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ফুটবল প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে এবং বিশ্বকাপের পরিধি বাড়িয়ে তিনি অনগ্রসর দেশগুলোর জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছেন।

এবার যেমন বিশ্বকাপে আরও ১৬টি বাড়তি দেশ অংশ নিতে পেরেছে, যার সিংহভাগই এসেছে কম শক্তিশালী কনফেডারেশনগুলো থেকে। ইউরোপ এই বাড়তি জায়গাগুলোর মধ্যে মাত্র ৩টি আসন পেয়েছে। ইনফান্তিনো এমন সব দেশকে স্বপ্ন ও আশা দেখিয়েছেন, যারা আগে কখনো বিশ্বকাপে খেলার কথা ভাবতেও পারত না—যেমন কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তান। ৪৮ দলের এই ফরম্যাট নিয়ে যতই সমালোচনা হোক না কেন, এটি কেপ ভার্দের মতো দেশকে তাদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ করেছে। এটি ঐতিহ্যগতভাবে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোকে তাদের খেলার মান বাড়াতে সাহায্য করবে, যা বিশ্ব ফুটবলের জন্য অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক।

ফিফার ওপর নির্ভরশীলতা

বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্ট এবং এর টিকিটের চড়া দাম থেকেই মূলত এই প্রকল্পগুলোর খরচ মেটানো হয়। চলতি বছরে ফিফা প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার আয় করবে বলে আশা করা হচ্ছে। উয়েফা হয়তো ফিফা ও ইনফান্তিনোর অনেক নীতির বিরোধিতা করে, কিন্তু উয়েফা নিজেই অনেক ধনী। নিজেদের অর্থায়ন তারা নিজেই করতে পারে। কিন্তু বিশ্বের বাকি দেশগুলো ইনফান্তিনো ও ফিফার তৈরি করা এই আয়ের ওপরই অনেকাংশে নির্ভরশীল।

ফিফার অধীনে মোট ২১১টি দেশ রয়েছে। সভাপতির নির্বাচনে প্রতিটি দেশের একটি করে ভোট দেওয়ার অধিকার আছে এবং জেতার জন্য ১০৬টি ভোটের প্রয়োজন হয়। গত এপ্রিলে দক্ষিণ আমেরিকান কনফেডারেশন (কনমেবল) জানায়, তাদের ১০টি দেশই ইনফান্তিনোকে সমর্থন করবে। এর তিন সপ্তাহ পর আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (ক্যাফ) তাদের ৫৪টি সদস্যদেশের পক্ষ থেকে ইনফান্তিনোকে পূর্ণ সমর্থনের কথা নিশ্চিত করে। এর পরপরই এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের ৪৭টি দেশও একই পথ অনুসরণ করে। অর্থাৎ, ইনফান্তিনোর ঝুলিতে ইতিমধ্যেই ১১১টি ভোট নিশ্চিত হয়ে আছে। তাঁকে হারানো অসম্ভব!