পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল আজ শেষ ৩২-এ জাপানের মুখোমুখি হচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি ব্রাজিলের সমর্থক হলেও একজন পেশাদার কোচ হিসেবে যুক্তি দিয়ে কৌশল বিশ্লেষণ করাই আমার কাজ। সেই যুক্তির সমীকরণ বলছে, জাপান ব্রাজিলের জন্য বড়সড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। লড়াইটি দুই ভিন্ন ঘরানার কৌশলের দারুণ এক প্রদর্শনী হতে পারে। কাগজে-কলমে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও মাঠের লড়াই হবে অনেকটা সমানে সমান। ম্যাচটি সম্ভবত একপেশে হবে না।
ব্রাজিলের উন্নতি ও কৌশলগত পরিবর্তন
মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের খেলায় যে ভারসাম্যের অভাব ছিল, তা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে তারা। শুরুর দিকে ফুটবলারদের মধ্যে কিছুটা মানসিক চাপ কাজ করছিল, বিশেষ করে রক্ষণে গ্যাব্রিয়েল বা মার্কিনিওসের মিস পাসগুলোতে, যা ছিল স্পষ্ট। তবে ব্রাজিল সেই সমস্যা কাটিয়ে উঠেই নকআউটের পরীক্ষায় নামছে।
ব্রাজিলের একাদশে কিছু কৌশলগত পরিবর্তন সুফল এনেছে। রাফিনিয়ার জায়গায় রায়ানের অন্তর্ভুক্তি ব্রাজিলের উইং প্লেকে আরও ধারালো করেছে। মাতেউস কুনিয়ার ভূমিকা প্রথাগত নাম্বার নাইন থেকে সরে এসেছে। কুনিয়া শুধু বক্সে থাকেন না, বরং বিল্ডআপে অংশ নেন এবং প্রেসিংয়ের জন্য নিচে নেমে আসেন। এতে ভিনিসিয়ুসের জন্য জায়গা তৈরি হয় এবং ব্রাজিল অনেক বেশি উদ্যমী হয়ে ওঠে। মাঝমাঠে ব্রুনো গিমারাইস দারুণ ফর্মে আছেন, যিনি এখন পর্যন্ত তিনটি অ্যাসিস্ট করে দলের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
জাপানের শক্তি ও চ্যালেঞ্জ
তবে জাপানকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাদের মূল শক্তি হলো দ্রুতগতির ট্রানজিশন এবং সেট পিস। জাপান সাধারণত ৩-৪-২-১ বা ৩-৪-৩ ফর্মেশনে খেলে থাকে, যেখানে তাদের উইং প্লে খুব গুরুত্বপূর্ণ। দাইজেন মায়েদা, রিতসু দোয়ানের মতো জাপানের দ্রুতগতির উইঙ্গারদের সামলানো সহজ হবে না ব্রাজিলের রক্ষণের জন্য। জাপানের প্রতি–আক্রমণ সামলাতে ব্রাজিলকে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গত ম্যাচের মতোই কৌশলী হতে হবে। আক্রমণে যাওয়ার সময় পেছনে অন্তত তিনজন ডিফেন্ডার রাখতে হবে, যাতে বল হারালে তাৎক্ষণিক ডিফেন্ডিং করা যায়। মিডফিল্ড এবং ফরোয়ার্ডরা যদি ট্রানজিশনের সময় অন্তত পাঁচ সেকেন্ড সময় পায়, তাহলে ব্রাজিলের ব্যাক থ্রির সঙ্গে মিডফিল্ডাররাও এসে যোগ দিতে পারবে। এতে জাপানের আক্রমণ গতি হারাতে পারে।
জাপানের সাফল্যের চাবিকাঠি
জাপান এই ম্যাচে ব্রাজিলের জয়রথ থামাতে চাইলে তাদের প্রধান অস্ত্র হতে হবে ‘মিড-ব্লক’ অর্থাৎ ব্লকটা মাঝমাঠে করতে হবে। ব্রাজিলের মতো দলের সঙ্গে লো–ব্লকে খেলে টিকে থাকা কঠিন হবে জাপানের জন্য। ব্রাজিলিয়ানদের চেয়ে তুলনামূলক টেকনিক্যাল স্কিলে পিছিয়ে জাপানিরা। তাই জাপানের গোলকিপারের সামনে বা উইংয়ে ফাঁকা জায়গা তৈরি হতে পারে, যা ব্রাজিলের মতো দল সহজেই কাজে লাগাবে। জাপানের সফল হওয়ার উপায় হলো মিড ব্লকে বল উইন করা। যদি তারা মাঝমাঠে বল কেড়ে নিতে পারে, তাহলে মাত্র দুই-তিন সেকেন্ডের মধ্যে দ্রুত প্রতি–আক্রমণের মাধ্যমে ব্রাজিলের গোলপোস্টে হানা দেওয়া সম্ভব।
ব্রাজিলের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য বনাম জাপানের দলগত কৌশল
ব্রাজিলের বড় সুবিধা হলো, তাদের খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য। দলগত কৌশল ঠিকভাবে কাজ না করলেও ব্যক্তিগত দক্ষতায় তারা গোল আদায় করে নিতে পারে। তবে ব্রাজিলের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা। যদি তারা নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারে, তাহলে ম্যাচটি ব্রাজিলের জন্য খুব একটা কঠিন হবে না। কিন্তু ব্রাজিলকে স্বাভাবিক ফুটবল খেলতে দেবে না জাপান। আর জাপান সেটা ঠিকঠাক করতে পারলে জমে উঠবে ম্যাচটা।
আধুনিক ফুটবলে কৌশলের চেয়েও কখনো কখনো বড় হয়ে ওঠে খেলোয়াড়দের মানসিক অবস্থা। খেলোয়াড়দের নিজেদের মতো করে ‘কমফোর্ট জোন’ বা স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে রাখা জরুরি। কার্লো আনচেলত্তি একজন অভিজ্ঞ কোচ। খেলোয়াড়দের ওপর কৌশলের বোঝা চাপিয়ে না দিয়ে তাদের সহজভাবে খেলার সুযোগ করে দেন তিনি। আর সেটার ফলও আসে।
ম্যাচের পূর্বাভাস
জাপান এরই মধ্যে বড় দলগুলোর সঙ্গে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। তাই আবেগ সরিয়ে রেখে নিরপেক্ষভাবে বললে মানসিক চাপমুক্ত থেকে যারা নিজেদের ম্যাচ পরিকল্পনা মাঠে বাস্তবায়ন করতে পারবে, তারাই শেষ হাসি হাসবে। এই জায়গায় ধারেভারে অবশ্যই এগিয়ে ব্রাজিল।
আজ ব্রাজিলের জয়ের সম্ভাবনাই তাই বেশি। সেটি অবশ্য ম্যাচের আগে খুব বড় আভাস দিচ্ছে না। শতাংশের হিসাবে ব্রাজিল ৫৫, জাপান ৪৫। আর স্কোরলাইন হতে পারে ব্রাজিলের পক্ষে ৩-২ বা ২-১। জাপানের লড়াকু ফুটবল আর ব্রাজিলের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের সঙ্গে দলীয় শক্তি—দুইয়ের দ্বৈরথে ফুটবলপ্রেমীরা একটি উপভোগ্য ম্যাচ আশা করতেই পারেন।



