চট্টগ্রামে প্রতি ৪ বাড়ির ১টিতে এডিস মশার লার্ভা, ৮ ওয়ার্ড রেড জোন
চট্টগ্রামে প্রতি ৪ বাড়ির ১টিতে এডিস লার্ভা, ৮ ওয়ার্ড রেড জোন

চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় ৩৭০টি বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগ। জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০০টি বাড়ির মধ্যে ২৭টিতে এডিস মশা বা ডেঙ্গুর লার্ভা পাওয়া গেছে; অর্থাৎ প্রতি চার বাড়ির মধ্যে একটিতে এডিস মশার লার্ভা বিদ্যমান।

জরিপের পদ্ধতি ও ফলাফল

গত ৮ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশার সার্ভে’ শিরোনামে জরিপ চালানো হয়। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরে জরিপের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়, যেখানে চার দফা জরুরি সুপারিশ রয়েছে।

জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপে তিনটি আন্তর্জাতিক সূচকের সব কটিতেই চট্টগ্রামের অবস্থান উদ্বেগজনক। বাসাবাড়ির টব ও টায়ারের পাশাপাশি এবার নির্মাণাধীন ভবনের ফ্লোরেও এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। জরিপে প্রাপ্ত লার্ভার ৭০-৮০ শতাংশই ডেঙ্গুর প্রধান বাহক ‘এডিস ইজিপ্টাই’ এবং ২০-৩০ শতাংশ ‘এডিস অ্যালবোপিকটাস’ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সূচক তিনটিতেই উচ্চ ঝুঁকি

স্বাস্থ্য বিভাগের জরিপ কর্মকর্তারা জানান, মশার লার্ভার উপস্থিতি ও ঘনত্ব বোঝার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে তিনটি সূচক ব্যবহার করা হয়: কনটেইনার ইনডেক্স (পরীক্ষা করা পাত্রের কত শতাংশে লার্ভা), হাউস ইনডেক্স (প্রতি ১০০ বাড়ির মধ্যে কতটিতে লার্ভা), এবং ব্রুটো ইনডেক্স (পাত্র ও বাড়ির আনুপাতিক হার)।

জরিপে ৩৭০টি বাড়ির বাইরে থাকা ৩৪৫টি কনটেইনার পরীক্ষা করে ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ পাত্রে লার্ভা পাওয়া গেছে। হাউস ইনডেক্স ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ব্রুটো ইনডেক্স ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ। স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, কনটেইনার ইনডেক্স ১০ শতাংশের বেশি হলে উচ্চ ঝুঁকি ধরা হয়; চট্টগ্রামে তা তিন গুণের বেশি। হাউস ইনডেক্স ৫ শতাংশের নিচে থাকার কথা, কিন্তু এখানে তা ২৬ শতাংশের বেশি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লার্ভার স্থান ও ওয়ার্ডভিত্তিক ঝুঁকি

প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রায় ৩০টি বাড়ি পরিদর্শন করে ৯৯টি বাড়ি ও ১১৪টি পাত্রে লার্ভা পাওয়া গেছে। এসব পাত্রের মধ্যে বালতি, ড্রাম, টব, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, এসির ট্রে, ফ্রিজের ট্রে, মাটির পাত্র, নির্মাণসামগ্রী উল্লেখযোগ্য। লার্ভার সংখ্যা ও ঘনত্ব বায়েজিদ ও শেরশাহ এলাকায় বেশি পাওয়া গেছে।

জরিপে নগরের ১৮টি ওয়ার্ড থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ৮টি ওয়ার্ডকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ বা রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো: উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ হালিশহর, পাথরঘাটা ও আন্দরকিল্লা। হাসপাতালেও এসব এলাকার রোগী বেশি।

চলতি বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রোববার পর্যন্ত চলতি বছর চট্টগ্রামে ২৮০ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। জুন মাসেই আক্রান্ত ১০৪ জন, যার মধ্যে ৬৬ জন সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা। নগর ও আশপাশের সীতাকুণ্ড, কর্ণফুলী ও হাটহাজারী উপজেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ৩০।

কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘জরিপের সুপারিশসহ আমরা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। আমাদের দিক থেকে পর্যাপ্ত স্যালাইন মজুত, নার্সদের প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য বিষয় নিশ্চিত করছি। সাধারণত জুলাই-নভেম্বরে রোগী বেশি দেখা যায়, সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’

প্রতিবেদনে ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমতে না দেওয়া, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং পানি জমতে পারে এমন স্থানে বিশেষ নজরদারির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক এডিস মশা দমনে কার্যকর কীটনাশক ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম বলেন, ‘৪১ নম্বর ওয়ার্ডে নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। এই ৮ ওয়ার্ডে সচেতনতা বৃদ্ধি করছি। রোগী যেখান থেকে আসছে, সেই এলাকা বা বাড়ি চিহ্নিত করে আশপাশে মশার ওষুধ ছিটানো হবে।’